প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কৌশলকে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী হিসেবে দেখছে ভারতের শীর্ষ শিল্প সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি (সিআইআই)। সংগঠনটির মতে, এই নীতিগত অবস্থান ভারতের নিজস্ব উন্নয়ন অভিজ্ঞতার সঙ্গে অনেকাংশে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আরও গভীর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভারতীয় শিল্প কনফেডারেশনের সদর দফতরে সফররত বাংলাদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ মন্তব্য করেন সংগঠনটির জ্যেষ্ঠ শিল্প ব্যক্তিত্ব পঙ্কজ ট্যান্ডন। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এমন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কেবল বিদ্যমান সম্পর্ক ধরে রাখাই যথেষ্ট নয়, বরং আগামী দিনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্পর্ককে আরও কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে।
পঙ্কজ ট্যান্ডনের ভাষায়, বাংলাদেশের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কৌশল মূলত দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনমুখী উন্নয়ন, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর জোর দিচ্ছে। তার মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী বা অন্তর্মুখী অর্থনৈতিক নীতি নয়; বরং জাতীয় সক্ষমতা শক্তিশালী করতে পরিকল্পিত অংশীদারিত্বের একটি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি বলেন, ভারতের নিজস্ব উন্নয়ন যাত্রাতেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। স্থানীয় শিল্প ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সমন্বয় করেই ভারত এগিয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে ভারতের অভিজ্ঞতার একটি স্বাভাবিক মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
সিআইআইয়ের এই কর্মকর্তা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান অবস্থাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তার মতে, এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
পঙ্কজ ট্যান্ডন বলেন, বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করা, অশুল্ক বাধা কমানো এবং সীমান্ত অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। বিশেষ করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও পণ্য পরিবহনে আধুনিকায়ন হলে ব্যবসায়িক খরচ কমবে এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল আরও কার্যকর হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের শিল্প সক্ষমতা এবং ভারতের উৎপাদন ও সেবা খাত একে অপরের পরিপূরক। ফলে সমন্বিত আঞ্চলিক মূল্য শৃঙ্খল গঠনের ক্ষেত্রে দুই দেশের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। তার মতে, প্রস্তাবিত সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি শুধু পণ্য বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সেবা, প্রযুক্তি সহযোগিতা, বিনিয়োগ সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতও এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তার মতে, স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা। আর এজন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং নকশাগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
পঙ্কজ ট্যান্ডন আরও উল্লেখ করেন, চিকিৎসা পর্যটন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক মূল্য শৃঙ্খল, ডিজিটাল অর্থনীতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার বড় সুযোগ রয়েছে।
তার মতে, ভারতের ডিজিটাল গণঅবকাঠামো, আর্থিক প্রযুক্তি, উৎপাদন দক্ষতা এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে সহায়ক হতে পারে। একইসঙ্গে বাংলাদেশও তার জনশক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থানের মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
অনুষ্ঠানে ভারতীয় শিল্প কনফেডারেশনের জ্যেষ্ঠ পরিচালক মনীষ মোহনও বক্তব্য দেন। তিনি ব্যবসা-টু-ব্যবসা সম্পর্ক আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা বাড়াতে যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই দেশ যদি পারস্পরিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোতে পারে, তবে দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক মানচিত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।