প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ভোটের ফলাফল প্রকাশের আগেই বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা, দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ সামনে এসেছে। ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা পরিকল্পিতভাবে তাদের দলীয় কার্যালয় দখল, হামলা ও আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে এমন উত্তেজনা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে আরও অস্থির করে তুলেছে।
সোমবার সকাল থেকে রাজ্যের বিভিন্ন গণনাকেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হওয়ার পরই রাজনৈতিক আবহাওয়া ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকে। প্রাথমিক ফলাফলে বিজেপি বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তৃণমূলের একাধিক স্থানীয় কার্যালয়ে হামলার খবর আসে। স্থানীয় ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাঁকুড়ার কোতুলপুর এলাকায় একটি তৃণমূল কার্যালয়ের ছাদে উঠে বিজেপির পতাকা টাঙানোর অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে উত্তর ২৪ পরগনার বরানগরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূলের একটি দলীয় কার্যালয় দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি, একদল বহিরাগত এসে কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং দলীয় ব্যানার-পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে। পরে সেখানে বিজেপির পতাকা উত্তোলনের চেষ্টা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটে পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের একটি দলীয় কার্যালয়ে আগুন লাগানোর অভিযোগ ওঠে বিজেপি সমর্থকদের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তি এসে কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। পরে আগুন ধরিয়ে দিলে মুহূর্তেই পুরো কার্যালয় পুড়ে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসকে কাজ করতে হয় দীর্ঘ সময়।
একই ধরনের অভিযোগ এসেছে জামুড়িয়া বিধানসভার চুরুলিয়া গ্রাম থেকেও। সেখানে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। দলটির স্থানীয় নেতারা দাবি করেছেন, নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে যাচ্ছে দেখে বিরোধীরা আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এছাড়া বীজপুর ও নোয়াপাড়াতেও তৃণমূলের প্রার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের নির্বাচন কমিশনও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন জেলার জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারদের ঘটনাস্থলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের কথাও ভাবা হচ্ছে বলে জানা গেছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় থাকবে।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি দলের প্রার্থী ও কাউন্টিং এজেন্টদের উদ্দেশে বলেন, কোনোভাবেই গণনাকেন্দ্র ছেড়ে যাওয়া যাবে না। তিনি অভিযোগ করেন, প্রথম কয়েক রাউন্ডে ইচ্ছাকৃতভাবে বিজেপির ফলাফল বেশি দেখানো হচ্ছে এবং বহু স্থানে গণনা ধীরগতিতে পরিচালিত হচ্ছে।
মমতা বলেন, “আমি আগেই বলেছিলাম, প্রথম দুই-তিন রাউন্ডে ওদের ফল আগে দেখাবে। অনেক জায়গায় কাউন্টিং বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কিছু ইভিএমে গরমিল পাওয়া গেছে। মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।” তিনি আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও প্রশাসনের একটি অংশ পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে।
দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “ভয় পাবেন না। সূর্যাস্তের পর ছবিটা বদলে যাবে। আমরা বাঘের বাচ্চার মতো লড়ব।” তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তৃণমূল সমর্থকেরা এটিকে নেত্রীর সাহসী বার্তা হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে বিজেপি নেতারা বলছেন, ভোটে পিছিয়ে পড়েই মমতা এমন অভিযোগ তুলছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন বরাবরই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে থাকে। তবে এবারের নির্বাচন আরও বেশি উত্তেজনাপূর্ণ, কারণ বিজেপি প্রথমবারের মতো রাজ্যে সরকার গঠনের সম্ভাবনার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া তৃণমূলও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের ফলাফল যেদিকেই যাক না কেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই নির্বাচন বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজ্যের গ্রামীণ ও শহুরে ভোটারদের মধ্যে বিভাজন, বেকারত্ব, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক— সবকিছু মিলিয়ে এবারের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এখন উদ্বেগ বাড়ছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ফল ঘোষণার পর সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দুই দলের সমর্থকেরা মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে, সেখানে পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে। ইতোমধ্যে কয়েকটি এলাকায় দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।
ভারতের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজেপি যদি শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করতে পারে, তবে তা হবে রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় এক পরিবর্তন। অন্যদিকে তৃণমূল আবারও ক্ষমতায় ফিরতে পারলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এদিকে ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক উত্তেজনা যে কমছে না, সেটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে প্রতিটি ঘণ্টার সঙ্গে। দলীয় কার্যালয়ে হামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং প্রশাসনের ওপর চাপ— সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ এখন এক অনিশ্চিত রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।