প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ইতিহাসে আবারও এক বিভীষিকাময় ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় যুক্ত হলো। মঙ্গলবার ভোরে কিয়েভ এবং দনিপ্রোর মতো প্রধান ইউক্রেনীয় শহরগুলো লক্ষ্য করে রাশিয়া একযোগে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। এই আকস্মিক ও শক্তিশালী হামলায় অন্তত ১০ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় একশ জন। মস্কোর পক্ষ থেকে বড় ধরনের হামলার যে ইঙ্গিত কয়েকদিন ধরেই দেওয়া হচ্ছিল, তা যেন আজ ভোরে ভয়াবহ বাস্তবতায় রূপ নিল। ইউক্রেনের আকাশসীমা ভেদ করে আসা এই হামলায় শহরগুলোর আকাশ ছেয়ে যায় ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে, আর ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, রুশ হামলায় অন্তত চারজন নিহত এবং শিশুসহ ৫৮ জন আহত হয়েছেন। হামলার ভয়াবহতা কতটা তীব্র ছিল, তা বোঝা যায় বাসিন্দাদের আর্তনাদে। শহরের একটি আবাসিক ভবনে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ২৪ তলা একটি অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের অংশবিশেষ ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মেয়র ক্লিচকো জানিয়েছেন, ওবোলন জেলায় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কয়েকটি গাড়িতে আগুন ধরে যায় এবং একটি কিন্ডারগার্টেনের কাছাকাছি এলাকায়ও আগুনের শিখা ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ভোরের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার আতঙ্কিত মানুষ জান বাঁচাতে ছুটতে থাকেন মেট্রো স্টেশনগুলোর দিকে। অনেকে নিজেদের প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় ও বিছানাপত্র নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিয়েছিলেন।
এদিকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর দনিপ্রোতে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় আরও ছয়জন নিহত এবং ৩৬ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আঞ্চলিক গভর্নর ওলেক্সান্দর হানঝা জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ছবি প্রকাশ করেছেন, তাতে বিধ্বস্ত আবাসিক ভবন, পুড়ে যাওয়া যানবাহন এবং বিধ্বস্ত শিশুদের খেলার মাঠের দৃশ্য দেখে যে কারো হৃদয় শিউরে উঠবে। কিয়েভ ও দনিপ্রো ছাড়াও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলেও রুশ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি শিশুসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে পুরো ইউক্রেনজুড়ে বিমান হামলার সতর্কবার্তায় এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ বিরাজ করছে।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই বড় ধরনের রুশ হামলার গোয়েন্দা সতর্কবার্তার কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, রাশিয়া বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে এবং ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনী ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত রয়েছে। এই হামলাকে গত সপ্তাহে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত লুহানস্ক অঞ্চলের একটি ছাত্রাবাসে ড্রোন হামলায় ২১ জন নিহতের ঘটনার প্রতিক্রিয়া বা প্রতিশোধ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। যদিও ইউক্রেন ওই হামলায় জড়িত থাকার কথা সরাসরি অস্বীকার করেছে, তবুও ক্রেমলিন কিয়েভে ‘পরিকল্পিত’ এবং বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক হামলার হুমকি আগেই দিয়ে রেখেছিল। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করলেও, ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পগুলো যেন তার বিপরীত কথাই বলছে।
ওলহা মুদ্রা নামে কিয়েভের এক বাসিন্দা, যার ছয় বছর বয়সী মেয়ে নাতালিয়াকে নিয়ে তিনি কোনোমতে রক্ষা পেয়েছেন, সেই আতঙ্কের মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, আমরা যখন প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শুনি, তখন বুঝে উঠতে পারছিলাম না আসলে কী ঘটছে। মনে হচ্ছিল যেন পৃথিবীর শেষ সময় এসে গেছে। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, ধোঁয়ায় সবকিছু ঢেকে গিয়েছিল। কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রুশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে গর্জে উঠলেও সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফেরেনি। একের পর এক বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয়েছে শহরটি।
যুদ্ধের ভয়াবহতা কেবল ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউক্রেনও সমানতালে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ও গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোতে। বেলগোরোদ অঞ্চলে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় ১১ বছর বয়সী এক কিশোর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, রাতভর রাশিয়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৪৮টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ক্রিমিয়ার সেভাস্তোপল নৌঘাঁটিতেও হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের এই পারস্পরিক হামলার প্রতিযোগিতায় সাধারণ নাগরিকদের জীবন ও নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত শান্তির প্রতিটি উদ্যোগ ও আলোচনার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত মোকাবিলায় মনোযোগী হওয়ায় ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, রাশিয়া ও ইউক্রেনের এই অবিরাম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কেবল অবকাঠামো বা সামরিক সরঞ্জামের ক্ষতি করছে না, বরং একটি গোটা প্রজন্মের স্বপ্নকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। কিয়েভ বা দনিপ্রোর ধ্বংসস্তূপের নিচে যে সাধারণ মানুষের কান্না, তার কোনো সান্ত্বনা নেই। রাশিয়া ও ইউক্রেন একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের যে খেলায় মেতেছে, সেখানে বলির পাঁঠা হচ্ছে নিরীহ বেসামরিক জনগোষ্ঠী। বিশ্ব সম্প্রদায় এই যুদ্ধের অবসান চাইলেও কোনো কার্যকর সমাধান এখনো অধরা। কবে এই যুদ্ধের কালো মেঘ সরে যাবে এবং ইউক্রেনের আকাশে শান্তির সূর্য উঠবে, তা আজও এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিটি ইউক্রেনীয় আজ কেবল বেঁচে থাকার প্রার্থনা করছে।