প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিক্ষার্থীদের চরম দুর্ভোগের প্রেক্ষাপটে দেশের পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী বছর থেকে বর্ষা মৌসুমে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাকে ধাপে ধাপে স্বাভাবিক শিক্ষা ক্যালেন্ডারে ফিরিয়ে আনতে পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের কাজও শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষা প্রশাসনকে একাধিক বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষার্থীদের কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। কোথাও সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে, কোথাও আবার সময়মতো পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়েই ভবিষ্যতে বর্ষাকাল এড়িয়ে পাবলিক পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনায় পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের কাজ চলছে। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো বর্ষাকালে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা না নেওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা জানুয়ারি মাসে শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে, যাতে শিক্ষাবর্ষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসে।
সচিব আরও বলেন, বর্ষা মৌসুমে পরীক্ষা আয়োজনের ফলে শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, অভিভাবক, শিক্ষক, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যা পরীক্ষা পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বেও শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন পরীক্ষার নতুন সময়সূচির পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের শিক্ষা ক্যালেন্ডার পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় আগামী শিক্ষাবর্ষে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা জানুয়ারিতে এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা বছরের প্রথমার্ধেই সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর মতে, এতে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সময়ের অপচয় কমবে এবং শিক্ষাব্যবস্থা আরও সুশৃঙ্খল হবে।
করোনা মহামারির পর দেশের পাবলিক পরীক্ষার ক্যালেন্ডার দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। ২০২০ সালে এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল করে ফল প্রকাশ করা হয় বিকল্প মূল্যায়নের মাধ্যমে। এরপর ২০২১ সালে ডিসেম্বর, ২০২২ সালে নভেম্বর এবং ২০২৩ সালে আগস্টে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালে জুন মাসে পরীক্ষা শুরু হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তা নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী শেষ করা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালে জুনের শেষ দিকে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছর পরীক্ষা আরও আগে নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তা পিছিয়ে ২ জুলাই থেকে শুরু করা হয়। ফলে পরীক্ষা বর্ষার মধ্যভাগে পড়ে যায় এবং বৃষ্টিজনিত দুর্ভোগ আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
শিক্ষা বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, পরীক্ষার সময় নির্ধারণে আবহাওয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। দুটি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অতীতে সাধারণত বর্ষা মৌসুমে পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। চলতি বছর বিশেষ পরিস্থিতির কারণে এ সময় পরীক্ষা আয়োজন করতে হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষার সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, কোমরসমান পানি অতিক্রম করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব পরীক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। কেউ সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে, আবার কেউ নানা বাধার মুখে পড়ে। ফলে পরীক্ষার পরিবেশে বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে পাবলিক পরীক্ষার সময় নির্ধারণে শুধু শিক্ষা প্রশাসনের পরিকল্পনাই নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন, মৌসুমি বৃষ্টিপাত এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগকালীন শিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি জাতীয় নীতিমালা প্রণয়নেরও প্রয়োজন রয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আকস্মিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষা খাত আরও প্রস্তুত থাকতে পারে।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কমিটির আহ্বায়ক জেসমিন তাসলিমা বানু বলেন, প্রায় ১৩ লাখ পরীক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ের একটি পরীক্ষার সূচি পরিবর্তন করা অত্যন্ত জটিল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। বর্তমানে সারা দেশে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। যদি কোনো অঞ্চলে পরীক্ষা স্থগিত রেখে পরে নেওয়া হয়, তাহলে আলাদা প্রশ্নপত্র প্রস্তুত, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষা প্রশাসনের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ৭ জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু করা। কিন্তু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবির কারণে তা প্রায় এক মাস পিছিয়ে ২ জুলাই শুরু করতে হয়। এই সিদ্ধান্তের ফলেই পরীক্ষা বর্ষার মধ্যভাগে চলে আসে এবং বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমে আসবে। পাশাপাশি শিক্ষা ক্যালেন্ডার আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, ফল প্রকাশ এবং নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করার প্রক্রিয়াও আরও সুশৃঙ্খল হবে।
বর্তমান উদ্যোগকে শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা পরিকল্পনা প্রণয়নই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে আগামী বছর থেকেই শিক্ষার্থীরা বর্ষাকালের দুর্ভোগ এড়িয়ে আরও অনুকূল পরিবেশে পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।