গুলশানের বাড়ি মামলায় আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায়

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ২৮ বার
গুলশানের বাড়ি মামলায় আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক রায়

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর গুলশানের একটি মূল্যবান আবাসিক সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা বহুল আলোচিত আইনি বিরোধে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আপিল বিভাগের রায়ে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নামে সম্পত্তির রেজিস্ট্রি এবং পরবর্তীকালে ওই সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট সব ধরনের হস্তান্তর ও নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে রায়ের ফলে সম্পত্তির প্রকৃত মালিকের কাছে বাড়িটি ফেরত যাওয়ার পথ সুগম হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ গত সোমবার এ রায় ঘোষণা করেন। পরদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে মামলার বাদীপক্ষের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম জানান, আদালতের এই রায়ের ফলে প্রকৃত মালিকের সম্পত্তি ফিরে পেতে আর কোনো আইনি বাধা নেই। তিনি বলেন, দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সর্বোচ্চ আদালতের এ সিদ্ধান্ত সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

মামলার নথি অনুযায়ী, গুলশান মডেল টাউন আবাসিক এলাকার সিডব্লিউএন (নর্থ) ব্লকের ৩৬ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর বাড়িটি বন্ধক রেখে এআরএ জুট ট্রেডিং করপোরেশন অগ্রণী ব্যাংক থেকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে। পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করে।

তবে মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন প্রাসঙ্গিক নীতিমালা অনুযায়ী মূল ঋণের তিনগুণ অর্থ, কস্ট অব ফান্ড এবং ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করে বন্ধকী সম্পত্তি ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য এআরএ জুট ট্রেডিং করপোরেশন আবেদন করেছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদও সেই আবেদন অনুমোদন করেছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে একটি কথিত সমঝোতা স্মারক তৈরি করে নজরুল ইসলাম মজুমদার ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী প্রায় ১৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেন এবং অগ্রণী ব্যাংক তাঁর নামে সম্পত্তিটি রেজিস্ট্রি করে দেয়। এই রেজিস্ট্রির বৈধতা নিয়েই পরবর্তীকালে একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগে গড়ায়।

মামলার অন্যতম আলোচিত দিক হলো বিচারাধীন অবস্থায় এআরএ জুট ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ারুল কবির খানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ। মামলার নথিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০১৮ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাঁকে গুম করে একটি গোপন বন্দিশালায় বা কথিত ‘আয়নাঘরে’ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে চলমান মামলা প্রত্যাহার করতে বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও চাপ প্রয়োগ করা হয়। এমনকি ক্রসফায়ারের ভয় দেখানো হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। এসব অভিযোগ আদালতের নথিতে উপস্থাপিত হয় এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে।

মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু আনোয়ারুল কবিরই নন, তাঁর আইনজীবী ফিদা এম. কামালকেও বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয়ধারী সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা অস্ত্রের মুখে আনোয়ারুল কবিরকে আদালতে নিয়ে গিয়ে মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করেন। পরবর্তীতে নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি দেশত্যাগ করেন।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে ফিরে আনোয়ারুল কবির গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে অভিযোগ দাখিল করেন। একই সঙ্গে তিনি আপিল বিভাগে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ভয়ভীতি ও জোরপূর্বক পরিস্থিতির মধ্যে মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছিল এবং তা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। আপিল বিভাগ আবেদনটি গ্রহণ করে পুনরায় শুনানির নির্দেশ দেন। দীর্ঘ শুনানি, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের পর সর্বোচ্চ আদালত শেষ পর্যন্ত আনোয়ারুল কবিরের আপিল মঞ্জুর করেন।

আদালতের রায়ে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া সম্পত্তির রেজিস্ট্রি এবং পরবর্তী সময়ে সম্পত্তি সম্পর্কিত সব ধরনের নিবন্ধন ও হস্তান্তর অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে আইনগতভাবে সম্পত্তির মালিকানা পুনরায় প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বিতর্কিত সম্পত্তি হস্তান্তর, ব্যাংক-সংক্রান্ত জটিলতা এবং জালিয়াতির অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণের পর সেই সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা এবং প্রাপ্য পক্ষের অধিকার যথাযথভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা বিতর্ক দেখা দিলে তা দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্য আর্থিক ও আইনি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

তবে আদালতের রায়ে উল্লেখিত গুম, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং মামলা প্রত্যাহারে বাধ্য করার অভিযোগগুলো ফৌজদারি অভিযোগের আওতায় পড়ে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত, বিচারিক প্রক্রিয়া বা কমিশনের অনুসন্ধানের ফলাফল পৃথক আইনি প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। আদালতের এই রায় মূলত সম্পত্তির মালিকানা ও নিবন্ধনের বৈধতা সম্পর্কিত দেওয়ানি বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর কেন্দ্রীভূত।

পর্যবেক্ষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই মামলার নিষ্পত্তির মাধ্যমে সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। একই সঙ্গে এটি আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং সম্পত্তি নিবন্ধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন হলে প্রকৃত মালিক তাঁর সম্পত্তির দখল ফিরে পাবেন এবং দীর্ঘ আইনি অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত