জিএম কাদেরের অভিযোগে উত্তপ্ত এরশাদ স্মরণসভা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৫৮ বার
জিএম কাদেরের অভিযোগে উত্তপ্ত এরশাদ স্মরণসভা

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, নির্বাচন ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক বোঝাপড়া রয়েছে এবং তারা ভাগাভাগির ভিত্তিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে তিনি সাম্প্রতিক নির্বাচন, গণআন্দোলনের ফলাফল এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে নানা পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রংপুর নগরীর পল্লীনিবাসে আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জিএম কাদের বলেন, বাইরে থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে তাদের মধ্যে সমঝোতা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিএনপি, জামায়াত-শিবির এবং তাদের মিত্ররা রাজনৈতিকভাবে একসঙ্গে কাজ করছে। তিনি দাবি করেন, এসব দল মানুষের সামনে ভিন্ন বার্তা দিলেও তাদের নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বিদ্যমান। তিনি আরও বলেন, তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয় পার্টিও রয়েছে।

জিএম কাদের তাঁর বক্তব্যে দেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতের নির্বাচনগুলোতে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে এবং ভোট গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশের বিভিন্ন ধাপে স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। তাঁর দাবি, ২০১৮ সালের নির্বাচনে দিনের ভোট রাতে হয়েছে এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় ভোট গ্রহণের পরিবর্তে ফলাফল কাগজে-কলমে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তাঁদের কাছে তথ্য ও নথি রয়েছে। যদিও তিনি বক্তব্যে এসব দাবির পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ প্রকাশ করেননি।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আরও অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোথায় কোন প্রার্থীকে বিজয়ী করা হবে এবং কোথায় জাতীয় পার্টিকে বিজয়ী হতে দেওয়া হবে না—এমন পরিকল্পিত রাজনৈতিক সমন্বয় ছিল। তিনি বলেন, সময় এলে এসব বিষয়ে আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে। তাঁর মতে, যে নির্বাচনকে তিনি একতরফা বলে উল্লেখ করেছেন, তা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মানদণ্ড পূরণ করে না।

তবে জিএম কাদেরের এসব অভিযোগের বিষয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে তাঁর বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক মন্তব্য ও অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

স্মরণসভায় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে কিছু মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হামলার ঘটনা ঘটছে। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের সমর্থক বা সহযোগী হিসেবে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনি, হামলা কিংবা সম্পত্তি ধ্বংসের মতো ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে অভিযোগ ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতেও ভিন্ন ধরনের উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে।

জিএম কাদের জুলাই গণআন্দোলন সম্পর্কেও তাঁর মূল্যায়ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ আন্দোলনকে তিনি সম্পূর্ণ সফল কিংবা সম্পূর্ণ ব্যর্থ—কোনোটিই বলতে চান না। তাঁর মতে, এটি একটি অসমাপ্ত আন্দোলন। তিনি দাবি করেন, বৈষম্যহীন সমাজ, জবাবদিহিমূলক সরকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। ফলে আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

স্মরণসভায় বক্তারা সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক জীবন, রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা এবং জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা করেন। দলটির নেতারা বলেন, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছেন এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করেই দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, কো-চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন নেতা বক্তব্য দেন। তারা সংগঠনের বর্তমান কার্যক্রম, সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। একই সঙ্গে এরশাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর অবদান স্মরণ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় স্মরণসভা বা দলীয় কর্মসূচিগুলো প্রায়ই রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে নির্বাচন, জোট রাজনীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়। তবে এ ধরনের বক্তব্যের ক্ষেত্রে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিক্রিয়াও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের আরও মত, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে আস্থা ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ, স্বচ্ছ নির্বাচন ব্যবস্থা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ অপরিহার্য। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত এবং প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হতে পারে।

রংপুরের এই স্মরণসভায় জিএম কাদেরের বক্তব্য দেশের চলমান রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাঁর উত্থাপিত অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিলেও এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার দিকেও এখন নজর থাকবে। এদিকে জাতীয় পার্টি জানিয়েছে, দলীয় কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মসূচিও পর্যায়ক্রমে ঘোষণা করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com