প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফিফা বিশ্বকাপের টানা তৃতীয় ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর নিজের দল এবং ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স নিয়ে কঠোর আত্মসমালোচনা করেছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। সেমিফাইনালে ইউরোপিয়ান শক্তিধর স্পেনের কাছে ২-০ গোলের পরাজয়ের পর তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন, বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে সাফল্য পেতে যে মানের ফুটবল প্রয়োজন, ফ্রান্স সেই মানে খেলতে পারেনি। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষ স্পেনের কৌশলগত দক্ষতা, বল নিয়ন্ত্রণ এবং ম্যাচ পরিচালনার ক্ষমতারও প্রশংসা করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে স্পেন। বলের দখল, মাঝমাঠের আধিপত্য এবং আক্রমণ গঠনের ধারাবাহিকতায় ফরাসি রক্ষণকে একাধিকবার চাপে ফেলে তারা। অন্যদিকে, বিশ্বকাপজুড়ে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখানো ফ্রান্স এদিন নিজেদের পরিচিত ছন্দে ফিরতে পারেনি। আক্রমণভাগে কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে ও সতীর্থরা সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হন, আর মাঝমাঠেও স্পেনের নিয়ন্ত্রণ ভাঙতে পারেনি দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা।
ম্যাচ শেষে ফরাসি সংবাদমাধ্যম এম৬-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমবাপে বলেন, দল পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, কৌশলগত, টেকনিক্যাল এবং সামগ্রিক পারফরম্যান্স—প্রতিটি বিভাগেই ফ্রান্স পিছিয়ে ছিল। তিনি বলেন, বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো বড় ম্যাচে প্রয়োজনীয় মানের ফুটবল খেলতে না পারলে জয় পাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে, দল নিজেদের সক্ষমতার সর্বোচ্চটা মাঠে তুলে ধরতে পারেনি এবং সেই ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
স্পেনের খেলার ধরন নিয়ে প্রশংসা করে এমবাপে বলেন, প্রতিপক্ষ শুরু থেকেই নিজেদের পরিকল্পনায় অটল ছিল। তারা বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং ফ্রান্সকে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দেয়নি। তিনি জানান, ফ্রান্স শুরু থেকেই উচ্চ প্রেসিংয়ের মাধ্যমে স্পেনকে চাপে রাখতে চেয়েছিল, যাতে তারা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে না পারে। কিন্তু সেই কৌশল কার্যকর হয়নি।
এমবাপের মতে, ম্যাচের অন্যতম বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে মাঝমাঠের লড়াই। তিনি বলেন, প্রেসিংয়ের সময় বারবার তিন বনাম দুই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে স্পেন সংখ্যাগত সুবিধা পেয়েছে। ফলে ফরাসি মিডফিল্ডারদের জন্য বল পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর ভাষায়, স্পেনের মতো উচ্চমানের দলের বিপক্ষে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ম্যাচে ফিরে আসা অত্যন্ত কঠিন।
ফরাসি অধিনায়ক আরও বলেন, দলের টেকনিক্যাল ভুলও পরাজয়ের অন্যতম কারণ। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সহজ পাসে ভুল, প্রথম স্পর্শে দুর্বলতা এবং আক্রমণ গঠনে সমন্বয়ের অভাব ফ্রান্সকে ভুগিয়েছে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, স্পেনের মিডফিল্ডার ফাবিয়ান রুইজ এবং রদ্রি অনেক বেশি সময় ও জায়গা পেয়েছেন। তাঁদের স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ দেওয়ায় স্পেন সহজেই ম্যাচের ছন্দ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে।
তিনি বলেন, বল পুনরুদ্ধারের পর প্রথম পাস এবং প্রথম টাচের মানও বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের উপযোগী ছিল না। ছোট ছোট ভুলগুলোই শেষ পর্যন্ত বড় ব্যবধান তৈরি করেছে। এমবাপের মতে, এমন ম্যাচে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সামান্য ভুলও বড় মূল্য দিতে বাধ্য করে।
এই পরাজয়ের মাধ্যমে ফ্রান্সের সামনে ইতিহাস গড়ার একটি বিরল সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২২ সালে রানার্সআপ হওয়ার পর এবার টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছিল দলটি। কিন্তু সেমিফাইনালেই সেই যাত্রার ইতি ঘটেছে। ম্যাচ শেষে হতাশা লুকাননি এমবাপে। তিনি বলেন, শুধু খেলোয়াড়রাই নন, পুরো ফ্রান্সই এই পরাজয়ে হতাশ। দলের লক্ষ্য ছিল আবারও ফাইনালে উঠে দেশের মানুষকে নতুন স্বপ্ন দেখানো এবং নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচে স্পেনের সংগঠিত ফুটবল এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণই জয়-পরাজয়ের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। ফ্রান্সের দ্রুতগতির আক্রমণকে কার্যকরভাবে আটকে রেখে নিজেদের পাসিং ফুটবলের মাধ্যমে পুরো ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেছে স্প্যানিশরা। বিশেষ করে বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে তোলার যে কৌশল স্পেন দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করে আসছে, এই ম্যাচেও সেটিই সফল হয়েছে।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের জন্য এই পরাজয় অবশ্যই হতাশার হলেও দলটির সামনে ভবিষ্যতের জন্য নতুন করে পরিকল্পনা করার সুযোগ রয়েছে। এমবাপে এখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত এবং তাঁর নেতৃত্বে আগামী আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাগুলোতে ফ্রান্স আবারও শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা করছে সমর্থকরা। তবে সেমিফাইনালের এই হার স্পষ্ট করে দিয়েছে, শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলে কেবল ব্যক্তিগত প্রতিভা নয়, দলগত সমন্বয়, কৌশলগত শৃঙ্খলা এবং মানসিক দৃঢ়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পরাজয়ের পর এমবাপের খোলামেলা আত্মসমালোচনা ইতোমধ্যেই ফুটবল অঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, একজন অধিনায়ক হিসেবে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করার মানসিকতা ভবিষ্যতে দলকে আরও শক্তিশালী হতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে স্পেনের পারফরম্যান্সের প্রতি তাঁর সম্মান প্রদর্শনও ক্রীড়াসুলভ মনোভাবের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ফ্রান্সের বিশ্বকাপ মিশন শেষ হলেও এমবাপের বক্তব্য ফুটবলপ্রেমীদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরেছে—বিশ্বমঞ্চে সাফল্য অর্জনের জন্য প্রতিটি বিভাগে নিখুঁত পারফরম্যান্সের বিকল্প নেই। আর সেই শিক্ষা নিয়েই আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতি শুরু করবে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।