প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশ যখন তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় প্রতিটি ঘনফুট গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময় চুরি, অবৈধ সংযোগ, পাইপলাইনের লিকেজ এবং সিস্টেম লসের কারণে বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার গ্যাস অপচয় হচ্ছে। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন এবং সাধারণ আবাসিক গ্রাহক—সব খাতেই গ্যাসের ঘাটতি প্রকট হলেও মূল্যবান এই জ্বালানি সম্পদের একটি বড় অংশ নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় সিস্টেম লস কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিতরণ কোম্পানিগুলোর নানা সীমাবদ্ধতা, অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং পুরোনো পাইপলাইন সংস্কারে ধীরগতির কারণে এখনো সিস্টেম লস ৯ শতাংশেরও বেশি রয়েছে। এই অতিরিক্ত ক্ষতির আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সাভারের আশুলিয়ার একটি রপ্তানিমুখী স্পিনিং মিলের চিত্রই বর্তমান বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না থাকায় কারখানার একাধিক জেনারেটর পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। কোনোটি সম্পূর্ণ বন্ধ, আবার কোনোটি অর্ধেকেরও কম ক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা এবং বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। একই ধরনের সংকটে দেশের অসংখ্য শিল্পকারখানা প্রতিদিন ক্ষতির মুখে পড়ছে।
শুধু শিল্পখাতই নয়, সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে দীর্ঘ সময় যানবাহনের সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। এতে জ্বালানি সরবরাহে বিলম্বের পাশাপাশি কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ও বিনিয়োগ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যখন দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে, তখন সিস্টেম লস কমানোই হতে পারে সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। কিন্তু অবৈধ সংযোগ, গ্যাস চুরি, পাইপলাইনের দীর্ঘদিনের লিকেজ এবং দুর্বল তদারকির কারণে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হচ্ছে না।
দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাস বিতরণ প্রতিষ্ঠান তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি জানিয়েছে, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পাইপলাইন মেরামতের কাজও জোরদার করা হয়েছে।
তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) মো. শাহজাদা ফরাজী বলেন, অবৈধ সংযোগ বন্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি লিকেজ শনাক্ত ও মেরামতের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ পাইপলাইন সংস্কারের মাধ্যমে সিস্টেম লস কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।
তবে জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, কেবল অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা, পাইপলাইন পুনর্বাসন এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ গ্যাস অপচয় অব্যাহত থাকবে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় না আনলে সিস্টেম লস কমানো সম্ভব হবে না। তাঁর মতে, জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সংকট নিরসন সম্ভব নয়।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিনই প্রায় দেড় হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার কারখানা এবং পরিবহন খাত ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং এলএনজি আমদানির পাশাপাশি বিদ্যমান গ্যাসের অপচয় রোধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চুরি ও সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অতিরিক্ত কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। এতে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদার প্রেক্ষাপটে গ্যাসের প্রতিটি ইউনিটের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্টদের মতে, কঠোর আইন প্রয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন, নিয়মিত নজরদারি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে গ্যাসের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে এবং দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।