প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় দেশের অন্যতম পার্বত্য জেলা বান্দরবান ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে জেলার নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার অনেক ওপরে উঠে বিস্তীর্ণ জনপদ প্লাবিত হয়েছে। পাহাড় ধস, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া, কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়া এবং বহু পরিবারের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় জেলার সামগ্রিক পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, বান্দরবানের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা এ বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস। তিনি জানান, গত ৬ থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত জেলায় মোট ৫৮১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৩৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ২৯টি ইউনিয়ন সরাসরি বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে বান্দরবান পৌরসভা, সদর উপজেলা এবং লামা পৌর এলাকা। বহু গ্রাম এখনো আংশিক পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেও অনেকে এখনো দুর্বিষহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ পর্যন্ত জেলায় ৪৯টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ১১টি বড় ধরনের ভূমিধস সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। পাহাড় ধসে লামা উপজেলায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পানিতে ডুবে আরও একজন প্রাণ হারিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন এবং উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো দুর্গত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবারের বসতঘর আংশিক বা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের বহু মানুষ নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যাভাব এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
অবকাঠামো খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের আওতাধীন প্রায় ৬৫ কিলোমিটার সড়ক এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ৯০ কিলোমিটার সড়ক বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সড়ক ভেঙে যাওয়ায় এবং পাহাড় ধসে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষি খাতেও বড় ধরনের ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ২ হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি, ফলের বাগান এবং বিভিন্ন ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৫ হাজার ২০ জন কৃষক সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ধান, সবজি, ফলের বাগান এবং অন্যান্য মৌসুমি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ভবিষ্যৎ উৎপাদন ও জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, এবারের বন্যায় সড়ক, কৃষি, বসতবাড়ি এবং বিভিন্ন অবকাঠামো মিলিয়ে জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখনো বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ চলছে। সব তথ্য হাতে পাওয়ার পর মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ত্রাণ বিতরণ, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন একযোগে কাজ করছে। দুর্গত মানুষের জন্য শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পার্বত্য এলাকায় টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নতুন করে পাহাড় ধস এবং আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পার্বত্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি, পাহাড় ধস এবং আকস্মিক বন্যার ঘটনা বাড়ছে। ফলে শুধু তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রম নয়, দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পাহাড় সংরক্ষণ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন।
এদিকে প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যার পানি ধীরে ধীরে কিছু এলাকায় কমতে শুরু করলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও মানবিক সংগঠনগুলোকেও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।