প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশকে আরও সবুজ, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি শিশুদের প্রতি প্রতি বছর অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর এবং সেই গাছের পরিচর্যা করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, একটি গাছ শুধু ছায়া বা সৌন্দর্যের উৎস নয়, এটি মানুষের জীবন, পরিবেশ ও ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। তিনি শিশুদের গাছের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানার জন্য গবেষণামনস্ক হওয়ারও পরামর্শ দেন।
বুধবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দেশব্যাপী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠানের আগে আয়োজিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে একযোগে বৃক্ষরোপণের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে একটি নিমগাছের চারা রোপণ করে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। সরকারের এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রাঙ্গণে একই দিনে প্রায় দুই লাখ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তোলা, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে সবুজায়নের আওতায় আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্বুদ্ধ করা।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশু শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, গাছটি বিদ্যালয়ে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা আশপাশের যে কোনো উপযুক্ত স্থানে লাগানো যেতে পারে। তবে শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হবে না, সেটির নিয়মিত পরিচর্যাও করতে হবে, যাতে গাছটি বড় হয়ে মানুষের উপকারে আসতে পারে।
তিনি শিশুদের উদ্দেশে আরও বলেন, একটি গাছ কতটুকু অক্সিজেন উৎপাদন করে, কীভাবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং মানুষের জীবনে কী ধরনের অবদান রাখে, সে বিষয়ে ইন্টারনেট ও বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানার চেষ্টা করতে হবে। এভাবে প্রতি বছর নতুন একটি গাছ সম্পর্কে জানলে প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যালয়ে লাগানো একটি গাছ যখন বড় হবে, তখন সেটি শিক্ষার্থীদের ছায়া দেবে, বিশ্রামের জায়গা হবে এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলবে। একইভাবে বাড়িতে লাগানো একটি গাছ বড় হলে সেটি শুধু নির্মল বাতাসই দেবে না, বরং গরমের সময় আশপাশের পরিবেশকে শীতল রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই নিবিড় সম্পর্ক নতুন প্রজন্মকে উপলব্ধি করতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আজকের দিনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গাছ রোপণের এই উদ্যোগ দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারি এই কর্মসূচি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বৃক্ষরোপণের আগ্রহ সৃষ্টি করবে এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের উদ্যোগে সবুজায়নের পরিধি আরও বিস্তৃত হবে।
অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক শিশু শিক্ষার্থীদের তৈরি বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করেন। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, পরিবেশ সংরক্ষণে তাদের অংশগ্রহণ এবং প্রকৃতি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি আগ্রহের সঙ্গে খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও পরিবেশবান্ধব চিন্তাধারার প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিনিধি, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। ঘনঘন তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণ শুধু পরিবেশ রক্ষার একটি কার্যকর উপায় নয়, বরং কার্বন শোষণ, বায়ুদূষণ হ্রাস, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পরিবেশবিদদের মতে, শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ভবিষ্যতে একটি পরিবেশ-সচেতন প্রজন্ম গড়ে উঠবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক এ ধরনের কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক অংশগ্রহণের মানসিকতা তৈরিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও ধীরে ধীরে সবুজ ক্যাম্পাসে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়।
সরকারের সাম্প্রতিক এ উদ্যোগকে পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে দেশব্যাপী সবুজায়নের গতি আরও বাড়বে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে উন্মুক্ত স্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়কের পাশে এবং গ্রামীণ এলাকায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের মূল বার্তা ছিল একটি গাছকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে দায়িত্বশীলতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং গবেষণামনস্ক মানসিকতা তৈরি করা। সংশ্লিষ্টদের আশা, দেশের লাখো শিক্ষার্থীর হাতে লাগানো আজকের এই চারাগুলো একদিন বড় হয়ে শুধু ছায়া কিংবা ফলই দেবে না, বরং একটি আরও সবুজ, নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশের প্রতীক হয়ে উঠবে।