বন্যা পুনর্বাসনে সমন্বিত কর্মসূচির তাগিদ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ১৫ বার
বন্যা পুনর্বাসনে সমন্বিত কর্মসূচির তাগিদ

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করতে এবং বিধ্বস্ত অবকাঠামো দ্রুত পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেছেন, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন শুধু ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ আবাসন এবং জীবিকা পুনরুদ্ধার—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

মঙ্গলবার বান্দরবান পার্বত্য জেলায় অতিবৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সভায় জেলার সামগ্রিক বন্যা পরিস্থিতি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, অবকাঠামোর বর্তমান অবস্থা, জনদুর্ভোগ, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ভবিষ্যৎ পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রতিমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় ভিন্ন। পাহাড়ধস, সড়ক বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা এবং দুর্গম জনপদের কারণে দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বন্যাকবলিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করাই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। সদর থেকে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ, সেতু-কালভার্ট, বিদ্যুৎ সরবরাহ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং অন্যান্য জরুরি অবকাঠামো দ্রুত সংস্কার করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্থানীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেন, প্রতিটি দপ্তরকে নিজ নিজ দায়িত্বাধীন ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার সময় যেন কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বা ব্যক্তি তালিকার বাইরে না থাকে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তথ্য সংগ্রহে স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হলে সরকারি সহায়তা প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানো সহজ হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা বন্যার কারণে বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, পাহাড়ধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার ক্ষতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া এবং কৃষি ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেন। এসব সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

মতবিনিময় সভায় বান্দরবান সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী, সংরক্ষিত নারী আসনের তিন পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মাধবী মার্মা, জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস, পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার, সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা নিজ নিজ দপ্তরের কার্যক্রম, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিবৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে শুধু ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে দুর্যোগ-সহনশীল পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। সড়ক নির্মাণ, পাহাড় সংরক্ষণ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি পুনর্বিন্যাসের মতো বিষয়গুলোও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক বন্যার কারণে পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে, বহু পরিবার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সেবাখাতে সাময়িক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা সমন্বিতভাবে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং জরুরি সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

উল্লেখ্য, গত ১০ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক বিশেষ সরকারি গেজেটের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিভাগে সাম্প্রতিক বন্যাজনিত দুর্যোগ মোকাবেলায় উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সমন্বিত করার লক্ষ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করা হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পরদিন তিনি চট্টগ্রামে গিয়ে বিভিন্ন উপজেলার বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি রাঙামাটি, বান্দরবান এবং কক্সবাজার জেলার বন্যাকবলিত এলাকাও পরিদর্শন করে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পার্বত্য অঞ্চলের পুনর্বাসন কার্যক্রম সফল করতে হলে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত সহযোগিতাও প্রয়োজন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপদ আবাসন, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় পার্বত্য অঞ্চলের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত