নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনে কী বদল এলো

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ১৬ বার
নতুন সাইবার সুরক্ষা আইনে কী বদল এলো

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাইবার অপরাধ দমনে আইনি কাঠামো আরও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সম্প্রতি সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ পাস হয়েছে। গত ৩০ জুন সংসদে বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়ার মাধ্যমে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জনের পর পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়। নতুন আইনটিতে একদিকে যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিপফেইক, অনলাইন প্রতারণা ও সাইবার হয়রানির মতো আধুনিক অপরাধকে স্পষ্টভাবে আইনের আওতায় আনা হয়েছে, অন্যদিকে পূর্ববর্তী আইনগুলোর বিতর্কিত কিছু বিধানও বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার ও সরকারি সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এখনও আরও কিছু সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশের সাইবার আইন নিয়ে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিতর্ক ও সংস্কারের আলোচনা চলেছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বহুল সমালোচিত ৫৭ ধারা থেকে শুরু করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, পরে সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং সর্বশেষ সাইবার সুরক্ষা আইন—প্রতিটি পর্যায়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং সাইবার অপরাধ দমনের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। নতুন আইনটি সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নতুন আইনটি মূলত ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের ভিত্তিতেই তৈরি হলেও সংসদে পাসের আগে এতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত ধারাগুলো সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে সরকার জানিয়েছে, একই দিনে জাতীয় সংসদে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ পাস হওয়ায় অনলাইন জুয়া সংক্রান্ত অপরাধের জন্য পৃথক আইন কার্যকর হয়েছে। ফলে সাইবার সুরক্ষা আইনে একই বিষয় পুনরায় রাখার প্রয়োজনীয়তা ছিল না।

সংসদে বিলটি পাসের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুয়া প্রতিরোধের জন্য পৃথক আইন কার্যকর হওয়ায় সাইবার সুরক্ষা আইনে এ-সংক্রান্ত ধারা আর রাখার প্রয়োজন নেই। তাই সংশ্লিষ্ট অংশটি বাদ দিয়েই নতুন আইনটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।

নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে তৈরি ডিপফেইক কনটেন্টকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। বর্তমান সময়ে ভুয়া ভিডিও, ছবি কিংবা অডিও ব্যবহার করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং মানহানির ঘটনা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। নতুন আইনে এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে স্পষ্ট শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করলে তিনি আইনগতভাবে দায়ী হবেন।

একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য, মানহানিকর ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণার সংজ্ঞাও নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনপ্রণেতাদের মতে, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে উদ্ভূত নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলার জন্য এই সংজ্ঞাগুলো আধুনিকায়ন করা জরুরি ছিল।

নতুন আইনের আওতায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং সরকার অনুমোদিত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আপত্তিকর বা আইনবিরোধী অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ কিংবা ব্লক করার নির্দেশ দিতে পারবে। সরকারের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ এবং ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্ট দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

আইনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে অবৈধ প্রবেশ, হ্যাকিং অথবা সাইবার হামলার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, সফটওয়্যার ডেভেলপার কিংবা এআই টুল ব্যবহারকারী ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যব্যবস্থায় অবৈধভাবে প্রবেশ করে ক্ষতি করলে তার বিরুদ্ধে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর থেকে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

সাইবার স্পেস ব্যবহার করে প্রতারণা, আর্থিক জালিয়াতি কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেললে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া সাইবার সন্ত্রাস, অনুমোদনবিহীন ইলেকট্রনিক লেনদেন, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, রিভেঞ্জ পর্ন, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন, ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক কনটেন্ট প্রকাশকেও দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

নারী ও শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও নতুন আইনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া আইডি, এআই-নির্ভর ডিপফেইক, ব্যক্তিগত ছবি বিকৃতি এবং ব্ল্যাকমেইলিংয়ের ঘটনা বাড়তে থাকায় এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর যৌন হয়রানি মোকাবিলায় এই বিধানগুলো সময়োপযোগী।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহার মতে, নতুন সাইবার সুরক্ষা আইন আগের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও বাস্তবমুখী। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিপফেইক, ভুয়া তথ্য এবং ডিজিটাল প্রতারণা মোকাবিলায় আইনটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে তিনি মনে করেন, আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করবে দক্ষ তদন্ত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. বি. এম. মইনুল হোসেনের মতে, নতুন আইনটি পূর্ববর্তী নিবর্তনমূলক আইনের তুলনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। আগের মতো অধিকাংশ অপরাধ অজামিনযোগ্য রাখা হয়নি, যা নাগরিকদের জন্য স্বস্তির বিষয়। তবে তিনি মনে করেন, সরকারের কোনো সংস্থা যদি নাগরিকের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন করে, তাহলে তার জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত হবে—সে বিষয়ে আইনে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। ভবিষ্যতে এ বিষয়টি যুক্ত করা হলে আইনটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।

নতুন আইনে বিচার প্রক্রিয়ার সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনের অধীন দায়ের হওয়া কোনো মামলায় অভিযোগ গঠনের পর ট্রাইব্যুনালকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সময়সীমা সর্বোচ্চ আরও ৯০ কার্যদিবস বাড়ানো যেতে পারে। দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশে সাইবার আইন সংস্কারের ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। ২০০৬ সালের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা দীর্ঘদিন ধরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগে সমালোচিত ছিল। পরে ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও একই ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করে। ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইনেও সমালোচনার অবসান হয়নি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২০২৫ সালে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যেখানে বিতর্কিত কয়েকটি ধারা বাতিল করা হয় এবং নাগরিকের ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সর্বশেষ সাইবার সুরক্ষা আইন সেই ধারাবাহিক সংস্কারের অংশ হিসেবে নতুন প্রযুক্তিগত বাস্তবতা ও সামাজিক প্রয়োজনকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান আইনের মাধ্যমে একদিকে যেমন প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়েও ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনটির নিয়মিত পর্যালোচনা, বাস্তবভিত্তিক সংশোধন এবং স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এটি বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে এবং ডিজিটাল নাগরিকদের জন্য একটি নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত