সংবিধান ইস্যুতে মুখোমুখি সরকার-বিরোধী দল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ১৯ বার
সংবিধান ইস্যুতে মুখোমুখি সরকার-বিরোধী দল

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার ও সংশোধনকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সরকার বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই বিশেষ সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো এই প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছে। সংসদে ওয়াকআউটের পর তারা রাজপথেও আন্দোলন জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে। ফলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী পক্ষের অবস্থান এখন স্পষ্টভাবে দুই ভিন্ন পথে দাঁড়িয়ে গেছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান সংবিধানেই সংশোধনের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। সেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ, অংশীজন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ প্রস্তুত করবে। পরে সেই সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে।

সরকারের এই অবস্থানের বিপরীতে বিরোধী দলগুলোর দাবি, এটি কেবল সংবিধান সংশোধনের বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের প্রশ্ন। তাদের মতে, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটে জনগণ যে মতামত দিয়েছে, তার আলোকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করেই নতুন সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণ করা উচিত। তাই সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংস্কারের উদ্যোগকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।

গত সোমবার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী কমিটিতে ১৭ জন সদস্য থাকার কথা ছিল। বিরোধী দলকে পাঁচজন সদস্যের নাম দিতে অনুরোধ জানানো হলেও তারা কোনো নাম দেয়নি। ফলে পাঁচটি পদ আপাতত শূন্য রেখেই কমিটি অনুমোদন করা হয়। সংসদে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের মধ্যেই প্রস্তাবটি পাস হয়।

কমিটিতে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে পরে মো. অলিউল্লাহ জানান, তাঁকে না জানিয়েই কমিটিতে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, কমিটি গঠনের সময় তিনি সংসদে উপস্থিত ছিলেন না এবং পরে গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন।

মো. অলিউল্লাহ বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষেই রয়েছে। তাঁর মতে, গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রক্রিয়া জনগণের সেই রায়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এর আগে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকেই তারা সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। তাই বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, জনগণের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ। সরকার যদি নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনগণের রায় গ্রহণ করতে পারে, তবে সংবিধান সংস্কারের প্রশ্নে গণভোটের ফলও সম্মান করতে হবে। অন্যথায় সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক ও টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁর দাবি, গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ যে মত দিয়েছে, সরকার তা উপেক্ষা করছে। তিনি অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আহ্বান জানান।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গণভোটের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সরকার সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে। তিনি জানান, সংসদের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত আন্দোলন সংগঠিত করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

জামায়াতের আরেক সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান প্রশ্ন তোলেন, অতীতে সংবিধান সংশোধনের সময় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রয়োজন হয়নি, এবার কেন নতুন এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, অতীতের কয়েকটি সংশোধনী আদালতে বাতিল হওয়ার অভিজ্ঞতার পর একটি নতুন ও গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন ছিল।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, বিদ্যমান সংবিধানের অধীনেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে যদি ভবিষ্যতে সংবিধানে সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত হয়, তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। তবে সেই অবস্থায় পৌঁছাতেও আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে এবং এ বিষয়ে আলোচনার সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হচ্ছে সংসদের বিশেষ কমিটি।

সরকারি সূত্রের ভাষ্য, বিশেষ কমিটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কমিটি নয়; বরং এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামত নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সংশোধনী প্রস্তাব তৈরির চেষ্টা করবে। সরকারের আশা, আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দূরত্ব কমানো সম্ভব হবে।

এদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে বিশেষ কমিটি গঠনের সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনও। দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণভোটে জনগণ মৌলিক সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সীমিত সংশোধনের উদ্যোগ জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুটি পৃথক সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি। সরকার বিদ্যমান সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংশোধনের পথ অনুসরণ করতে চায়। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো মনে করছে, জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের আলোকে একটি পৃথক সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা উচিত। ফলে এটি কেবল আইনি বা সাংবিধানিক বিতর্ক নয়; বরং রাজনৈতিক বৈধতা, জনমতের ব্যাখ্যা এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নির্ধারণের প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, সংবিধান সংস্কার ও সংশোধন নিয়ে চলমান এই মতপার্থক্য আগামী দিনগুলোতে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে থাকবে। সংসদে বিশেষ কমিটির কার্যক্রম, বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য সংলাপ—সবকিছুই নির্ধারণ করবে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ কোন সাংবিধানিক পথ অনুসরণ করবে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে কি না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত