প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কাতারের সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানির মৃত্যুতে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। প্রয়াত এই রাষ্ট্রনায়কের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে একটি শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর স্মরণে বুধবার দেশব্যাপী অর্ধদিবস রাষ্ট্রীয় শোক পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় শোকের অংশ হিসেবে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার পাশাপাশি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি শোক প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। পরে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দিলে উপস্থিত সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে তা অনুমোদন করেন। সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গৃহীত শোক প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে কাতার সরকার এবং ঢাকায় অবস্থিত কাতারের দূতাবাসে পাঠানো হবে, যাতে বাংলাদেশের জনগণ ও জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে জানানো শোক ও সমবেদনার বার্তা যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া যায়।
শোক প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর জাতীয় সংসদে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ সদস্য শামীম কায়সার মোনাজাত পরিচালনা করেন। এতে প্রয়াত শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানির বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয় এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার, কাতারের রাজপরিবার ও দেশটির জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।
এদিকে কাতারের সাবেক আমিরের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক শোকবার্তা পৌঁছে দিতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দোহায় গেছেন। মঙ্গলবার সকাল ১১টা ২০ মিনিটে তাঁকে বহনকারী বিমান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সফরকালে স্পিকার কাতারের বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে শোক ও সমবেদনার বার্তা তুলে দেবেন। সফর শেষে আগামী ১৬ জুলাই তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। শ্রমবাজার, জ্বালানি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। কাতারে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মরত রয়েছেন, যাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ফলে কাতারের সাবেক আমিরের মৃত্যু শুধু দেশটির জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনারূপে বিবেচিত হচ্ছে।
শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি ১৯৯৫ সালে কাতারের শাসনভার গ্রহণ করেন এবং ২০১৩ সাল পর্যন্ত দেশটির আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রায় দুই দশকের নেতৃত্বে কাতার অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি কাতারকে বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করার ভিত্তি গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হামাদের নেতৃত্বে কাতার শুধু জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতি, বিনিয়োগ, গণমাধ্যম, ক্রীড়া এবং মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তাঁর সময়েই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিকাশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে ব্যাপক সম্প্রসারণ এবং বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাতার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে।
২০১৩ সালে তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তাঁর পুত্র শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানির কাছে। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমী ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের উদাহরণ। এরপরও তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরামর্শদাতা হিসেবে সম্মানজনক অবস্থান বজায় রাখেন।
গত ১২ জুলাই ৭৪ বছর বয়সে শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশের পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং রাষ্ট্রপ্রধানেরা শোক প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের শোক প্রস্তাব এবং রাষ্ট্রীয় শোক পালন সেই আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা ও সমবেদনারই অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে শোক প্রস্তাব গৃহীত হওয়া দুই দেশের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের গভীরতার প্রতিফলন। একই সঙ্গে স্পিকারের দোহা সফর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শোকবার্তা সরাসরি কাতারের বর্তমান আমিরের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার ধারাবাহিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হামাদ বিন খলিফা আল-থানির নেতৃত্বে কাতারের যে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল, তার প্রভাব আজও দেশটির উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। তাঁর মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি যেমন একজন প্রভাবশালী নেতাকে হারিয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনীতিও হারিয়েছে এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ককে। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের শোক প্রস্তাব সেই অবদানের প্রতিই আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রকাশ করেছে।