পরীক্ষা শেষে সচিবালয়মুখী শিক্ষার্থীদের লংমার্চ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ১২ বার
পরীক্ষা শেষে সচিবালয়মুখী শিক্ষার্থীদের লংমার্চ

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত, দুর্যোগকবলিত অঞ্চলের পরীক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প পরীক্ষার ব্যবস্থা এবং শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন আরও জোরদার করেছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী বুধবার পরীক্ষা শেষে রাজধানীর উত্তরা বিএনএস সেন্টার থেকে সচিবালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে ‘লংমার্চ’ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। আন্দোলনকারীরা বলছেন, মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে পরীক্ষা স্থগিতের কোনো ঘোষণা না আসায় তারা এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বুধবার দেশের ৫৯ জেলায় এইচএসসি ও সমমানের বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সকাল ১০টায় শুরু হওয়া পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর অধীনে বিজ্ঞান বিভাগের পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) দ্বিতীয় পত্র, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের হিসাববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র এবং মানবিক বিভাগের যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আরবি দ্বিতীয় পত্র এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা-২ বিষয়ের পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং এর আওতাধীন মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পাঁচ জেলার পরীক্ষা স্থগিত রয়েছে।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান বন্যা, অতিবৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক পরীক্ষার্থীর জন্য বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অনেক শিক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি, আবার অনেকেই চরম দুর্ভোগের মধ্যে পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের দাবি, শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হলে দেশের সব শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

মঙ্গলবার দিনভর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল থেকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় এবং উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে তারা সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন। পরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের উদ্দেশে যাত্রা করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের সামনে পুলিশ তাদের অগ্রযাত্রায় বাধা দেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাক্কাধাক্কির ঘটনাও ঘটে। পরে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।

বাধার মুখে শিক্ষার্থীরা নীলক্ষেত মোড়ে অবস্থান নিয়ে পুনরায় মিছিল শুরু করেন এবং পরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে গিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা আলোচনার প্রস্তাব দিলেও আন্দোলনকারীরা তাদের দাবির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো বৈঠকে অংশ নেননি। এরপর তারা আবার সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে ফিরে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন।

দিনের শেষভাগে আন্দোলন আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে। সন্ধ্যায় শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর উভয় পাশে অবস্থান নেন এবং যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এই অবরোধের ফলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পদক্ষেপ নেয়। সন্ধ্যার দিকে পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিলে সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

আন্দোলনরত পরীক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ফল পাওয়া যায়নি বলে তারা দাবি করেন। পরে রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকা সিটি কলেজের পরীক্ষার্থী মিরাজ সংবাদমাধ্যমের সামনে বক্তব্য দিয়ে বলেন, সরকার তাদের মূল দাবিগুলোর কোনোটি গ্রহণ করেনি। তিনি ঘোষণা দেন, বুধবারের পরীক্ষা স্থগিত করা না হলে পরীক্ষার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে লংমার্চ কর্মসূচি পালন করা হবে।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য পরীক্ষা বন্ধ করানো নয়; বরং দুর্যোগকবলিত সব পরীক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। তারা দাবি করছেন, যেসব শিক্ষার্থী ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় বৈরী আবহাওয়ার কারণে অংশ নিতে পারেননি, তাদের জন্য পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি দেশের সার্বিক দুর্যোগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো স্থগিত রাখারও দাবি জানিয়েছেন তারা। এছাড়া শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে।

দিনভর আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। তাদের হাতে পরীক্ষা স্থগিত, শিক্ষার্থীবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ডও ছিল। আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।

অন্যদিকে শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরীক্ষা আয়োজন, দুর্যোগ পরিস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ—সব দিক বিবেচনায় রেখেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তবে এ বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা চলবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা আয়োজন সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে লাখো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে দুর্যোগকবলিত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রশাসন এবং সরকারের মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই সংকট সমাধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ হতে পারে। বর্তমানে সবার দৃষ্টি সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঘোষিত লংমার্চ কর্মসূচির দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত