প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে স্পেনের কাছে ২-০ গোলের পরাজয়ে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেছে ফ্রান্সের। প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে মাঠে নামলেও নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পেদের। এই হার শুধু ফুটবলারদের নয়, কোটি কোটি ফরাসি সমর্থকের কাছেও গভীর বেদনার। তবে এমন হতাশার মধ্যেও জাতীয় দলকে ঘিরে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি মনে করেন, এই পরাজয় মেনে নেওয়া কঠিন হলেও বর্তমান ফরাসি দলটি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসবে।
ডালাস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সেমিফাইনালে শুরু থেকেই স্পেন নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে সক্ষম হয়। বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের গতি এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তা—সব মিলিয়ে ম্যাচজুড়েই স্পেন ছিল অধিক আত্মবিশ্বাসী। বিপরীতে, ফ্রান্স আক্রমণে প্রয়োজনীয় ধার তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ছিল, সেটিও পূরণ হয়নি। পুরো ম্যাচে স্প্যানিশ রক্ষণভাগের চাপের মুখে বারবার আটকে যায় ফরাসি আক্রমণ।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় স্পেনকে ফাইনালে ওঠার জন্য অভিনন্দন জানান প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। একই সঙ্গে তিনি নিজের দেশের খেলোয়াড়দের সংগ্রামের প্রশংসা করেন। তিনি লেখেন, ‘যোগ্য দল হিসেবে ফাইনালে ওঠায় স্পেনকে অভিনন্দন। দেশের জার্সির মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার জন্য লে ব্লুজদের ধন্যবাদ। আজকের এই পরাজয় মেনে নেওয়া কঠিন। তবে আমাদের দল এখনো তরুণ এবং তাদের সামনে অসাধারণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।’
ম্যাক্রোঁর এই বার্তা দ্রুতই সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। অনেক ফরাসি সমর্থকও তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তাঁদের মতে, বর্তমান ফরাসি দলে অসাধারণ প্রতিভাবান অনেক তরুণ ফুটবলার রয়েছেন, যারা আগামী বছরগুলোতে ইউরোপীয় ও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের আরও শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারবেন।
ম্যাচের প্রথমার্ধ থেকেই স্পেন আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেয়। লামিন ইয়ামাল, দানি ওলমো এবং মিকেল ওয়ারজাবালের সমন্বিত আক্রমণ ফরাসি রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলে। স্পেনের এই ধারাবাহিক আক্রমণের ফল আসে প্রথমার্ধেই। ডি-বক্সের ভেতরে লামিন ইয়ামালকে ফাউল করলে রেফারি স্পেনের পক্ষে পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পট কিক নিতে এসে কোনো ভুল করেননি মিকেল ওয়ারজাবাল। ফরাসি গোলরক্ষক মাইক মাইগনানকে পরাস্ত করে স্পেনকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি।
প্রথম গোল হজমের পর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে ফ্রান্স। এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে এবং মিডফিল্ডারদের সমন্বয়ে কয়েকটি আক্রমণ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ রক্ষণ ভাঙতে পারেনি তারা। বরং পাল্টা আক্রমণে আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে স্পেন।
প্রথমার্ধের শেষদিকে দানি ওলমোর অসাধারণ একটি থ্রু-পাস ধরে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ফুলব্যাক পেদ্রো পোরো। আক্রমণে উঠে এসে তাঁর এমন গোল ফরাসিদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ফেরার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও গোলের দেখা পায়নি ফ্রান্স। অন্যদিকে স্পেন নিজেদের রক্ষণ সুসংগঠিত রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।
পুরো ম্যাচজুড়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন পেদ্রো পোরো। শুধু গোলই নয়, ডান প্রান্তে তাঁর রক্ষণ ও আক্রমণে সমান কার্যকর উপস্থিতি স্পেনের জয় নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে দানি ওলমো ও লামিন ইয়ামালও দুর্দান্ত নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন, যা স্পেনের সমন্বিত দলগত শক্তির প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, পুরো টুর্নামেন্টে স্পেনের সবচেয়ে বড় উন্নতি হয়েছে ফিনিশিংয়ে। গ্রুপ পর্ব ও নকআউটের কয়েকটি ম্যাচে সুযোগ তৈরি করেও গোল করতে না পারার যে সমস্যা ছিল, সেমিফাইনালে এসে সেটি অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে দে লা ফুয়েন্তের দল। আক্রমণভাগের কার্যকারিতা, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণভাগের শৃঙ্খলা—এই তিন বিভাগের ভারসাম্যই তাদের ফাইনালে পৌঁছে দিয়েছে।
অন্যদিকে ফ্রান্সের বিদায়ের পেছনে মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে আক্রমণভাগের অকার্যকারিতা। দখল কিংবা ব্যক্তিগত দক্ষতায় পিছিয়ে না থাকলেও গোলের সামনে কার্যকর হতে পারেনি তারা। বিশেষ করে স্প্যানিশ ডিফেন্ডারদের সংগঠিত রক্ষণভাগ এমবাপ্পেকে প্রায় পুরো ম্যাচজুড়েই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ তৈরি হলেও তা কাজে লাগাতে পারেনি ফরাসিরা।
তবু ফরাসি শিবিরে হতাশার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদেরও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বর্তমান স্কোয়াডে বেশ কয়েকজন তরুণ ফুটবলার রয়েছেন, যারা আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইতোমধ্যেই নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। অভিজ্ঞদের সঙ্গে তাদের সমন্বয় ভবিষ্যতে আরও পরিণত হলে ফ্রান্স আবারও বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপার দাবিদার হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকেরা। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর বক্তব্যেও সেই আস্থারই প্রতিফলন দেখা গেছে।
অন্যদিকে এই জয়ের মাধ্যমে নতুন ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে গেছে স্পেন। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এবার দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে লা রোজারা। দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবারও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে শিরোপা জয়ের সুযোগ পাচ্ছে তারা।
আগামী রোববার নিউইয়র্কের নিউজার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপের মহারণ। সেখানে দ্বিতীয় সেমিফাইনালের বিজয়ী ইংল্যান্ড অথবা আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হবে স্পেন। দারুণ ছন্দে থাকা স্প্যানিশরা আত্মবিশ্বাস নিয়েই মাঠে নামবে। অন্যদিকে ফ্রান্সকে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী আন্তর্জাতিক আসরের জন্য, যেখানে ম্যাক্রোঁর ভাষায় তরুণ এই দলটি আরও পরিণত হয়ে নতুন উদ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।