প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল আবারও পিছিয়ে গেছে। এ নিয়ে টানা ১৮ বারের মতো তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ফলে বহুল আলোচিত এই মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২০ আগস্ট নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় মামলার বিচারিক কার্যক্রমে বিলম্ব নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে নিহতের পরিবার, সহকর্মী এবং সমর্থকদের মধ্যে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশাও আরও জোরালো হয়েছে।
বুধবার ঢাকার এডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত ছিল। তবে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ঢাকা মেট্রো (পূর্ব) অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার ও তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর কাদির ভূঁঞা নির্ধারিত দিনে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি। এ কারণে আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২০ আগস্ট নতুন দিন ধার্য করেন।
আদালতের এ আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) রুকনুজ্জামান। তিনি জানান, অধিকতর তদন্ত এখনো শেষ না হওয়ায় সিআইডি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি। তদন্ত সম্পন্ন হলে পরবর্তী ধার্য তারিখে প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হবে।
এই মামলাটি শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। তবে সেই অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট হয়নি মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চ। তাদের অভিযোগ ছিল, তদন্তে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো যথাযথভাবে উঠে আসেনি এবং প্রকৃত ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপস্থাপিত হয়নি।
এরপর গত ১২ জানুয়ারি মামলাটি আদালতে শুনানির জন্য ওঠে। ওই দিন মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল জাবের অভিযোগপত্র পর্যালোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় চান। আদালত তাঁর আবেদন মঞ্জুর করে অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে শুনানির জন্য ১৫ জানুয়ারি দিন নির্ধারণ করেন।
পরবর্তী ধার্য তারিখে বাদীপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ডিবি পুলিশের দাখিল করা অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন দাখিল করে। মামলার বাদী ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের আদালতে দাবি করেন, অভিযোগপত্রে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হয়নি এবং তদন্ত আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। শুনানি শেষে আদালত নারাজি আবেদন গ্রহণ করে মামলাটির অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব সিআইডিকে প্রদান করেন। এরপর থেকেই সংস্থাটি মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
শরীফ ওসমান হাদি জুলাই অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আন্দোলনের সময় আলোচনায় আসেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় এই নেতা পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর অংশ হিসেবে গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গণসংযোগে অংশ নিতে গেলে সশস্ত্র হামলার শিকার হন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থায় মোটরসাইকেলে এসে দুর্বৃত্তরা হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। হামলার পরপরই তারা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি অস্ত্রোপচার শেষে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে একই রাতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েকদিন নিবিড় চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যুর খবর আসে। তাঁর মৃত্যু রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বাদী হয়ে রাজধানীর সংশ্লিষ্ট থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। পরে হাদির মৃত্যু হলে মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারাসহ প্রয়োজনীয় অভিযোগ যুক্ত করা হয়। প্রথমে থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও পরে মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পী, সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ফয়সাল করিম মাসুদসহ মোট ১৭ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাঁর সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিবি পুলিশের দাখিল করা অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা দাবি করেন, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নিহত হাদির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা পাওয়া যায় যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করাই হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তবে এসব পর্যবেক্ষণ নিয়ে বাদীপক্ষ আপত্তি জানিয়ে আরও গভীর তদন্তের দাবি তোলে। সেই প্রেক্ষাপটেই সিআইডিকে অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা না হওয়ায় মামলার অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
আইন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আলোচিত ও স্পর্শকাতর মামলার ক্ষেত্রে তদন্তে সময় লাগতে পারে। তবে একই সঙ্গে সময়মতো তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিচারিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা শুধু মামলার অগ্রগতিকেই বাধাগ্রস্ত করে না, বরং ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশাকেও দীর্ঘায়িত করে।
এদিকে মামলার পরবর্তী তারিখ ২০ আগস্ট নির্ধারণ করায় সেদিন সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারে কি না, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। নিহত শরীফ ওসমান হাদির পরিবার, সহকর্মী এবং সমর্থকদের প্রত্যাশা, অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটিত হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের বিধান অনুযায়ী কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা হবে।