নেতৃত্বের ব্যর্থতাই বড় মরণফাঁদ: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ১৭ বার
নেতৃত্বের ব্যর্থতাই বড় মরণফাঁদ: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেছেন, বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধকে অনেকে সবচেয়ে বড় মরণফাঁদ হিসেবে বিবেচনা করলেও তাঁর দৃষ্টিতে আরও বড় সংকট হলো রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সেই ব্যর্থতা, যেখানে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং প্রকৃত রাষ্ট্র সংস্কারের গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করা হয় না। তাঁর মতে, একটি রাষ্ট্র যখন দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং তরুণদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরিতে ব্যর্থ হয়, তখন পুরো একটি প্রজন্ম অনিশ্চয়তা, হতাশা ও প্রতিশ্রুতির আড়ালে প্রতারণার শিকার হয়।

বুধবার (১৫ জুলাই) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন। পোস্টে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পার হলেও বাংলাদেশ এখনো রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক দর্শন ও লক্ষ্য নির্ধারণে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ পর্যায়ে নানা আদর্শিক চর্চা থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষার ভিত্তি কী হবে, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতে, বর্তমান শিক্ষা কাঠামো বিজ্ঞান, কলা ও ব্যবসায় শিক্ষা—এই প্রচলিত বিভাজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। তিনি দাবি করেন, এই ব্যবস্থা দক্ষ, উদ্ভাবনী ও কর্মমুখী মানবসম্পদ তৈরির পরিবর্তে বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। তাঁর ভাষায়, শিক্ষাব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জনশক্তি গড়ে তোলা, যাতে তরুণরা উচ্চশিক্ষা শেষ করেই বাস্তব কর্মক্ষেত্রে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এখনো মূলত তৈরি পোশাক শিল্প এবং বিদেশে কর্মরত অদক্ষ শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল। এমন বাস্তবতায় নতুন শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না করেই একের পর এক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, এটিকে শিক্ষা সংস্কার হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও প্রকৃত অর্থে এটি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ, সৃজনশীল এবং প্রযুক্তিনির্ভর মানবসম্পদ গড়ে তোলার নীতি বাস্তবায়ন করা।

রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি মূলত দূরদর্শিতার অভাব এবং দলীয় সংকীর্ণ রাজনৈতিক মানসিকতাকেই দায়ী করেন। তাঁর মতে, জনগণের সামনে কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, রাষ্ট্র সংস্কার এবং উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। এর ফলে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে পড়েছে।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, অনেকেই ফারাক্কা বাঁধকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মরণফাঁদ বলে উল্লেখ করেন। তবে তাঁর দৃষ্টিতে আরও ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয় তখন, যখন রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মৌলিক সংস্কারের গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। কারণ, এর প্রভাব শুধু একটি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং একটি পুরো প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতির মোড়কে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

নিজের বক্তব্যে তিনি সংগ্রামের বিষয়টিও বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, যে গর্তই যত গভীর হোক না কেন, সংগ্রামী মানুষ সেখানে আত্মসমর্পণ করে না। যারা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও লড়াই করে এগিয়ে যেতে শিখেছে, তারা কখনো প্রতারণার কাছে নিজেদের বিবেক বিক্রি করে না। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশকেও সেই কঠিন বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও নীতিনিষ্ঠ সংগ্রামের পথেই এগোতে হবে।

চলমান এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, এই আন্দোলন কেবল একটি পরীক্ষা বা পরীক্ষার সময়সূচিকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন। তাঁর মতে, অল্প বয়সেই শিক্ষার্থীরা উপলব্ধি করেছে যে অন্যায্য সিদ্ধান্ত এবং অমানবিক চাপ মেনে নিলে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। সেই কারণেই তারা পরীক্ষার হল ছেড়ে রাজপথে নেমেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি আরও বলেন, এমন সিদ্ধান্ত কোনো শিক্ষার্থীর জন্য সহজ নয়। এই আন্দোলনের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হতে পারে, কেউ আইনি জটিলতায় পড়তে পারে, আবার কেউ সামাজিক বা পারিবারিক চাপের মুখেও পড়তে পারে। তবুও তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ ও অধিকারের প্রশ্নে আপস করেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়কের মতে, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন একটি মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, এই দাবির প্রতি তিনি সমর্থন প্রকাশ করছেন এবং তরুণদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পাশে রয়েছেন।

পোস্টের শেষাংশে তিনি দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে একটি বার্তা দেন। সেখানে তিনি তাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ এবং প্রতিবাদী চেতনাকে সম্মান জানান। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে, যেখানে শিক্ষা হবে দক্ষতানির্ভর, কর্মসংস্থান হবে বাস্তবমুখী এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। শিক্ষা সংস্কার, কর্মসংস্থান, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর উত্থাপিত বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। তবে এসব বক্তব্য তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক মতামত ও পর্যবেক্ষণ হিসেবেই প্রকাশিত হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত