ব্রয়লার উৎপাদনে বিশ্বে ৫৩তম বাংলাদেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ১৪ বার
ব্রয়লার উৎপাদনে বিশ্বে ৫৩তম বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে পোলট্রি শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে এই খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদনে এখনো শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর কাতারে পৌঁছাতে পারেনি বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৩তম। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, পোলট্রি খাদ্যের উচ্চমূল্য, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দক্ষ খামার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে দিচ্ছে না।

বাংলাদেশে গত এক দশকে পোলট্রি শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রাণিজ আমিষের বড় একটি অংশের চাহিদা পূরণ করছে এই খাত। ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির মাংস সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। পাশাপাশি ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশেও পোলট্রি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

তবে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক নিচে। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক ব্রয়লার উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৩তম। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে না পারলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে।

বিশ্বের ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদনে এখনো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কৃষি বিভাগের ২০২৫ সালের পূর্ণ বছরের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ২১ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদিত হয়েছে। বৈশ্বিক মোট উৎপাদনের প্রায় ১৭ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের অবদান। উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের মুরগি এবং উচ্চ উৎপাদনশীলতা দেশটিকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনসংখ্যার দেশটি ২০২৫ সালে প্রায় ১৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন ব্রয়লার মুরগির মাংস উৎপাদন করেছে। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণে চীন দীর্ঘদিন ধরেই পোলট্রি শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও বৃহৎ পরিসরের বাণিজ্যিক খামার দেশটির উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্রাজিল। দেশটি ২০২৫ সালে প্রায় ১৫ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন ব্রয়লার উৎপাদন করেছে। উৎপাদনের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুরগির মাংস রপ্তানিকারক দেশও ব্রাজিল। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত হিমায়িত মুরগির মাংস রপ্তানি করে দেশটি বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।

রাশিয়া উৎপাদনের দিক থেকে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটি নিজস্ব পোলট্রি শিল্পকে শক্তিশালী করেছে এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন ব্রয়লার উৎপাদন করেছে। অন্যদিকে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। ইউএসডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে প্রায় ৫ দশমিক ৪৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন ব্রয়লার মাংস উৎপাদিত হয়েছে। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনে সক্ষমতা এবং শিল্পে ধারাবাহিক বিনিয়োগ ভারতের সাফল্যের অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে খাদ্যের উচ্চমূল্য। একটি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনের মোট ব্যয়ের বড় অংশই খাদ্যের জন্য ব্যয় হয়। ভুট্টা, সয়াবিন মিল এবং অন্যান্য কাঁচামালের আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি দেশের পোলট্রি শিল্পে পড়ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন।

খাতসংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খামার ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাতের বাচ্চা, কার্যকর জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে উৎপাদন বাড়ানো কঠিন হবে। বিশেষ করে বার্ড ফ্লু এবং অন্যান্য সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে খামারিদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসম্মত ভেটেরিনারি সেবার সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক শিল্পে পোলট্রি খাতের অবদান দিন দিন বাড়ছে। নিরাপদ ও মানসম্পন্ন প্রাণিজ আমিষের চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি এই শিল্পে বিনিয়োগও বাড়ছে। তবে উৎপাদন ব্যয় কমানো, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে আরও এগিয়ে যেতে পারবে।

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পোলট্রি শিল্পকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনবল তৈরি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের ব্রয়লার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উৎপাদন তালিকায় দেশের অবস্থানও আরও উন্নত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোলট্রি খাত নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত