মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তি বৃদ্ধি, বাড়ছে যুদ্ধের শঙ্কা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
  • ৩০ বার
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শক্তি বৃদ্ধি, বাড়ছে যুদ্ধের শঙ্কা

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা নতুন করে আরও গভীর আকার ধারণ করেছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ, যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা এবং সমঝোতার বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ২০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং শত শত সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। একই সঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছে, যা গোটা অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, বুধবার সেন্টকম নিশ্চিত করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই মোতায়েনের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, নজরদারি বিমান এবং বিভিন্ন ধরনের সহায়ক সামরিক সরঞ্জাম। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক নৌপথ সুরক্ষিত রাখা এবং সম্ভাব্য হুমকির জবাব দেওয়ার সক্ষমতা আরও জোরদার করতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান আরও জোরালো হবে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ইরানের উপকূলীয় স্থাপনা এবং সমুদ্রসংলগ্ন বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে কঠোর হামলা চালাচ্ছে এবং প্রয়োজন মনে করলে এই অভিযান আরও বিস্তৃত করা হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি হামলা বন্ধের সিদ্ধান্ত না নেবেন, ততক্ষণ সামরিক অভিযান চলবে।

ট্রাম্প আরও বলেন, পরবর্তী কয়েক দিন এবং আগামী সপ্তাহে হামলার মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তিনি দাবি করেন, প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সেতুর মতো কৌশলগত স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান যদি আলোচনার টেবিলে না আসে, তাহলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর আরও কঠোর সামরিক চাপ প্রয়োগ করা হবে।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের সামনে একটি কার্যকর সমাধান হলো নতুন করে সমঝোতায় পৌঁছানো। তার মতে, আলোচনায় না এলে দেশটির জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই নৌপথে কোনো ধরনের বাধা গ্রহণযোগ্য নয়।

ট্রাম্প জানান, আগে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ফি আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও পরে তিনি সেই ধারণা থেকে সরে আসেন। কারণ, তার ভাষ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা শুল্ক আরোপের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে।

এর আগে সেন্টকম জানায়, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ওই এলাকায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছে। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ আরও কঠোরভাবে কার্যকর করার কথাও জানানো হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত কমানোর লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই উদ্যোগকে ঘিরে কূটনৈতিক অঙ্গনে আশাবাদ তৈরি হলেও বাস্তবে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপ থামেনি। বরং নতুন করে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং কঠোর বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সংলাপের পাশাপাশি যখন সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাত্রা বাড়তে থাকে, তখন ভুল বোঝাবুঝি বা আকস্মিক সংঘর্ষের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন পরিস্থিতি শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক মহল। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা সংযম প্রদর্শন, কূটনৈতিক সংলাপ অব্যাহত রাখা এবং উত্তেজনা কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেলে তা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা ইস্যু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর রয়েছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা পরিস্থিতি শান্ত করতে সক্ষম হবে, নাকি সামরিক উত্তেজনা আরও বড় সংঘাতে রূপ নেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত