প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাট সংলগ্ন পদ্মা নদীতে ধরা পড়া দুটি বিশাল আকৃতির বাঘাইড় মাছ বিক্রি হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ টাকায়। ভোরে স্থানীয় জেলেদের জালে ধরা পড়া ২৬ ও ৩২ কেজি ওজনের এই দুটি মাছকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়। পরে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে মাছ দুটি কিনে অনলাইনের সাহায্যে সিলেটের এক প্রবাসী ক্রেতার কাছে বিক্রি করেন স্থানীয় এক মাছ ব্যবসায়ী। নদীর বড় আকৃতির মাছের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ এবং অনলাইনভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থার কারণে অল্প সময়েই মাছ দুটি উচ্চমূল্যে বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) ভোরে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট সংলগ্ন পদ্মা নদীর বিভিন্ন স্থানে জাল ফেলেন স্থানীয় জেলে চালাক হালদার, মইনটের নয়ন হালদার এবং তাঁদের সহযোগীরা। মাছ ধরার একপর্যায়ে চালাক হালদারের জালে ২৬ কেজি ওজনের একটি বড় বাঘাইড় এবং নয়ন হালদারের জালে ৩২ কেজি ওজনের আরেকটি বাঘাইড় মাছ ধরা পড়ে। অস্বাভাবিক বড় আকারের মাছ দুটি ধরা পড়ার খবর দ্রুতই নদীপাড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয়দের পাশাপাশি মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।
পরে মাছ দুটি দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকার পরিচিত মাছ ব্যবসায়ী সম্রাট শাহজাহান শেখের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ওজন করে দেখা যায়, দুটি মাছের মোট ওজন ৫৮ কেজি। উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে ২৬ কেজি ওজনের বাঘাইড় মাছটি প্রতি কেজি ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং ৩২ কেজি ওজনের মাছটি প্রতি কেজি ২ হাজার টাকা দরে কিনে নেন তিনি। এতে মাছ দুটি কিনতে তাঁর মোট ব্যয় হয় ১ লাখ ৫ হাজার ৬০০ টাকা।
ব্যবসায়ী সম্রাট শাহজাহান শেখ জানান, বড় আকৃতির পদ্মার বাঘাইড় মাছের চাহিদা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সব সময়ই বেশি থাকে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বড় অনুষ্ঠান কিংবা পারিবারিক আয়োজনে এমন মাছের আলাদা কদর রয়েছে। তাই মাছ দুটি কেনার পর তিনি অনলাইনের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন।
পরবর্তীতে সিলেটের এক প্রবাসী ক্রেতা মাছ দুটি কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আলোচনা শেষে ২৬ কেজি ওজনের মাছটি প্রতি কেজি ১ হাজার ৭০০ টাকা এবং ৩২ কেজি ওজনের মাছটি প্রতি কেজি ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এতে মাছ দুটি বিক্রি করে মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ টাকা পান ব্যবসায়ী সম্রাট শাহজাহান শেখ। কেনা ও বিক্রির মূল্যের ব্যবধানে তিনি লাভও করেন।
সম্রাট শাহজাহান শেখ বলেন, পদ্মা নদীর বাঘাইড় মাছের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। স্বাদ, আকার এবং বিরলতার কারণে এই মাছের বাজারমূল্য সাধারণ মাছের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করা যায়, ফলে বড় মাছের ভালো দাম পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
স্থানীয় জেলেরা জানান, পদ্মা নদীতে আগে বড় আকারের বাঘাইড়, বোয়াল, কাতল ও রুই মাছ নিয়মিত ধরা পড়লেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের মাছের সংখ্যা কমে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নদীতে বড় মাছের উপস্থিতি কিছুটা বেড়েছে বলে তাঁদের পর্যবেক্ষণ। এতে জেলেদের মধ্যেও নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
গোয়ালন্দ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম পাইলট বলেন, বর্তমানে ইলিশ আহরণে মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় নদীতে অন্যান্য দেশীয় প্রজাতির মাছ নির্বিঘ্নে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে। এর ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে বাঘাইড়, বোয়াল, কাতল, রুইসহ বড় আকারের মাছ তুলনামূলক বেশি ধরা পড়ছে। তিনি বলেন, নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মাছের প্রজনন ক্ষেত্র রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ও মূল্যবান মাছ পাওয়া সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, নদীতে স্থায়ী অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণে বিধিনিষেধ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশীয় মাছের উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে যেমন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে, তেমনি জেলেদের আয়ও বাড়বে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঘাইড় বাংলাদেশের অন্যতম বড় স্বাদু পানির শিকারি মাছ। নদীর পরিবেশ ভালো থাকলে এবং খাদ্যের পর্যাপ্ততা থাকলে এ মাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তবে নদীদূষণ, অবৈধ মাছ শিকার এবং প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ার কারণে অনেক এলাকায় এই মাছের সংখ্যা কমে গেছে। তাই নদীর বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা নদীতে বড় আকারের মাছ ধরা পড়ার একাধিক ঘটনা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জেলেরা ভালো দাম পাচ্ছেন, ব্যবসায়ীরাও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে সহজেই মাছ পৌঁছে দিতে পারছেন। প্রযুক্তিনির্ভর বিপণন ব্যবস্থার কারণে এখন নদীর তাজা মাছ দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে।
স্থানীয়দের আশা, নদী সংরক্ষণ, প্রজনন মৌসুমে কঠোর নজরদারি এবং সরকারি উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে পদ্মা নদীতে ভবিষ্যতেও এমন বড় আকারের মূল্যবান দেশীয় মাছ আরও বেশি পাওয়া যাবে, যা জেলে পরিবারগুলোর জীবিকা এবং দেশের মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।