ককরোচ পার্টির মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ, বন্ধ মোবাইল ইন্টারনেট

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
  • ৫৫ বার
ককরোচ পার্টির মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ, বন্ধ মোবাইল ইন্টারনেট

প্রকাশ: ২০ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের রাজধানী দিল্লির রাজপথ যেন আজ এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সাক্ষী হয়ে রইল। একদিকে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন শুরুর আনুষ্ঠানিকতা, অন্যদিকে লক্ষাধিক তরুণের প্রাণের দাবি নিয়ে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজারো শিক্ষার্থী এবং তরুণ-তরুণী যখন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর থেকে সংসদের অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন, তখন তাদের গতিরোধ করে দিল্লি পুলিশ। শুরু হয় পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান ও দাঙ্গা-নিয়ন্ত্রণকারী বাহিনীর কঠোর আগ্রাসন। দিল্লির আকাশ-বাতাস আজ তরুণদের স্লোগান আর পুলিশের সাইরেনের শব্দে প্রকম্পিত। শিক্ষাঙ্গনে দুর্নীতি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন এখন কেবল একটি প্রতিবাদ নয়, বরং একে অনেকে ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন হিসেবে অভিহিত করছেন।

মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জাতীয় পরীক্ষায় কথিত অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগে উত্তাল পুরো ভারত। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দাবি, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অধীনে এমন দুর্নীতি মেনে নেওয়া যায় না, তাই অবিলম্বে তাঁর পদত্যাগ দাবি করছেন তারা। আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত সিজেপি বা ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র অনুসারীরা নিজেদের তেলাপোকা হিসেবে পরিচয় দিতেই গর্ববোধ করছেন। তাদের দর্শন হলো, তেলাপোকা যেমন শত প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকে এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে বের হওয়ার পথ খুঁজে নেয়, তারাও ঠিক সেভাবেই সিস্টেমের ভেতরকার দুর্নীতিকে সমূলে উৎপাটন করবে। এই ব্যঙ্গাত্মক অথচ গভীর অর্থবহ আন্দোলনের নাম যখন থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন থেকেই এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

দিল্লি পুলিশ এই মিছিলের অনুমতি না দিয়ে মধ্য দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্গপ্রাকারের মতো কঠোর করে তুলেছিল। ব্যারিকেড, চেকপোস্ট এবং দাঙ্গা-নিয়ন্ত্রণের বিশেষ যানবাহন মোতায়েন করার পাশাপাশি সতর্কতা হিসেবে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। এতে করে দিল্লির রাজপথ এখন জনশূন্য হয়ে পড়লেও মেট্রো স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে চরম বিশৃঙ্খলা। রাজধানীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি মেট্রো স্টেশন, যার মধ্যে রয়েছে রাজীব চক, জনপথ, প্যাটেল চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট এবং সেবা তীর্থ, সেগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অফিসগামী যাত্রী এবং পর্যটকদের দুর্ভোগের কোনো সীমা নেই। রাজীব চকের মতো ব্যস্ত ইন্টারচেঞ্জ স্টেশনে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি এবং গেট বন্ধ থাকার দৃশ্য যেন এক অবরুদ্ধ রাজধানীর প্রতিচ্ছবি।

এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুককে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি আরও আবেগপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায় ২১ দিন ধরে অনশনরত এই বীর যোদ্ধাকে শনিবার জোর করে হাসপাতাল থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যা সারা দেশে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে দেয়। বর্তমানে সফদরজং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও ওয়াংচুক দমে যাননি। হাসপাতাল থেকে তার পাঠানো হাতে লেখা একটি আবেগঘন বার্তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, মৃত্যুর পরও তার আত্মা এই আন্দোলনের পাশে থাকবে। ৯ কেজির বেশি ওজন কমে যাওয়ায় তিনি শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছেন, তবুও তার মনোবল অটুট। হাসপাতালের শয্যা থেকেই তিনি তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা থামিয়ে না দেয় এই সংগ্রাম। ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমো এখন আন্দোলনের হাল ধরেছেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও সংহতি তৈরি করেছে।

আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক এবং স্বচ্ছতাভিত্তিক। তারা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা নিয়ে রাস্তায় নামেননি, বরং তাদের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এবং দুর্নীতিমুক্ত পরীক্ষার নিশ্চয়তা। যখন একটি দেশের তরুণ প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে এবং প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য একটি অশনিসংকেত। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং মেধাবীদের অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন এখন কেবল একটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি ছড়িয়ে পড়েছে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে। যারা জীবন বাজি রেখে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়েছেন, তারা বিশ্বাস করেন যে বর্তমান শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ব্যর্থতা কেবল একটি পদত্যাগ দিয়েই শেষ হবে না, বরং পুরো ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন।

দিল্লি পুলিশের কঠোর ব্যবস্থা এবং इंटरनेट বিভ্রাট আন্দোলনকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করলেও তরুণদের মনে ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। লাঠিচার্জের ফলে অনেক শিক্ষার্থী আহত হওয়ার পরও তারা পিছু হটেনি। পুলিশের টিয়ারশেল এবং লাঠির আঘাতের চেয়ে তাদের কাছে তাদের স্বপ্নের মূল্য অনেক বেশি। রাজপথের এই লড়াই প্রমাণ করছে যে, বর্তমান প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের অধিকার আদায়ে কতটুকু সচেতন। আন্দোলনের প্রতিটি স্তরে শৃঙ্খলা এবং লক্ষ্য স্থির রাখার চেষ্টা করছে সিজেপি। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সমঝোতার ইঙ্গিত না পাওয়া গেলেও, এই উত্তাল পরিস্থিতি যে কোনো সময় আরও বড় কোনো সংকটের জন্ম দিতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

পরিশেষে বলা যায়, ভারতের গণতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র সংসদ ভবন যেখানে জনগণের কণ্ঠস্বর হওয়ার কথা, সেখানে আজ পুলিশের ব্যারিকেড ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরার দৃশ্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এটি শুধুমাত্র একটি সরকারি নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নয়, বরং একটি দেশের মেধাবী সন্তানদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তার জন্য লড়াই। প্রশাসন যদি সময়মতো এই আন্দোলনের গুরুত্ব অনুধাবন না করে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে না নেয়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তরুণদের এই তেজদীপ্ত সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত কোন গন্তব্যে পৌঁছায়, তা এখন দেখার অপেক্ষায় পুরো দেশ। ইতিহাসের পাতায় এই আন্দোলন হয়তো একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে, যেখানে তরুণরা প্রমাণ করেছে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তেলাপোকার মতো ছোট হলেও তারা ঐক্যবদ্ধ থাকলে তা পাহাড় সমান বাধার প্রাচীরকেও ভেঙে ফেলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত