প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারামে আগত হজযাত্রী ও ওমরাহ পালনকারীদের ইবাদতকে আরও নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং সুশৃঙ্খল করতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ডিজিটাল সেবা চালু করেছে সৌদি আরব। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে তাওয়াফ ও সায়ীর নির্ধারিত এলাকাগুলোর ভিড়ের সর্বশেষ অবস্থা রিয়েল-টাইমে জানা যাবে। ফলে মুসল্লিরা নিজেদের সুবিধামতো অপেক্ষাকৃত কম ভিড়ের সময় ও পথ নির্বাচন করে ইবাদত পালন করতে পারবেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের মতে, এই প্রযুক্তি শুধু তীর্থযাত্রীদের দুর্ভোগ কমাবে না, বরং পবিত্র দুই মসজিদে ভিড় ব্যবস্থাপনাকেও আরও কার্যকর ও আধুনিক করে তুলবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মসজিদ ও মসজিদে নববীর তত্ত্বাবধানকারী কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি এই ডিজিটাল সেবাটি চালু করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লাখো মুসল্লির নিরাপদ চলাচল এবং নির্বিঘ্ন ইবাদত নিশ্চিত করতেই এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে হজ ও ওমরাহ মৌসুমে যখন মসজিদুল হারামে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে, তখন ভিড় নিয়ন্ত্রণ অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। নতুন এই ব্যবস্থা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে তাওয়াফ এবং সায়ী করার স্থানগুলোর ভিড়ের ঘনত্ব সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। ব্যবহারকারীরা জানতে পারবেন কোন এলাকায় মানুষের উপস্থিতি বেশি এবং কোথায় তুলনামূলক কম ভিড় রয়েছে। এর ফলে তারা নিজেদের সুবিধামতো সময় ও পথ নির্বাচন করতে পারবেন। এতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন কমবে এবং ইবাদতের সময় স্বাচ্ছন্দ্যও বাড়বে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই সেবা ব্যবহারের জন্য কিউআর (QR) কোড প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। নির্ধারিত কিউআর কোড স্ক্যান করলেই ব্যবহারকারীরা একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে পারবেন। সেখানে রিয়েল-টাইম তথ্যের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, চলাচলের উপযোগী রুট এবং ভিড় এড়িয়ে নিরাপদে ইবাদত সম্পন্ন করার পরামর্শও পাওয়া যাবে। তথ্যগুলো নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে, যাতে ব্যবহারকারীরা সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশে প্রযুক্তির এই ব্যবহার একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রতিবছর হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য কোটি কোটি মুসলমান সৌদি আরবে যান। বিপুল এই জনসমাগমের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুষ্ঠুভাবে চলাচল বজায় রাখা সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সমন্বয়ে পরিচালিত নতুন এই ডিজিটাল সেবা সেই ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তুলবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক আধুনিকায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ই-ভিসা, ডিজিটাল পারমিট, স্মার্ট কার্ড, বহুভাষিক মোবাইল অ্যাপ, উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সেবা চালুর পর এবার রিয়েল-টাইম ভিড় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত হলো। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর ধর্মীয় সেবায় সৌদি আরব আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ভিড়ের তথ্য সরবরাহ নয়, এই প্রযুক্তি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলাতেও কার্যকর হবে। কোনো এলাকায় হঠাৎ অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হলে কর্তৃপক্ষ দ্রুত বিকল্প পথ নির্দেশনা দিতে পারবে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং জরুরি সেবাও দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে বয়স্ক, নারী, শিশু এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ মুসল্লিদের জন্য এই ব্যবস্থা আরও বেশি সহায়ক হবে।
হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করতে সৌদি সরকার দীর্ঘদিন ধরেই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আসছে। ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে তারা এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা নির্বিঘ্নে এবং স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে ইবাদত পালন করতে পারবেন। নতুন এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হজযাত্রী ও ওমরাহ পালনকারীদের জন্যও এই সেবা বিশেষভাবে উপকারী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভাষাগত ও পরিবেশগত পার্থক্যের কারণে অনেক সময় ভিড়ের মধ্যে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। রিয়েল-টাইম তথ্য ও নির্দেশনা থাকলে তারা সহজেই কম ভিড়ের পথ নির্বাচন করতে পারবেন এবং কম সময়ের মধ্যে নিরাপদে ইবাদত সম্পন্ন করতে পারবেন।
ধর্মীয় সেবায় প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ ভবিষ্যতেও আরও বিস্তৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সৌদি আরব ইতোমধ্যে স্মার্ট অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর ধারাবাহিকতায় মসজিদুল হারামে চালু হওয়া নতুন এই ডিজিটাল ভিড় ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা শুধু মুসল্লিদের সুবিধাই বাড়াবে না, বরং বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশগুলোর একটি পরিচালনায় আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের অনন্য উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হবে।