প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশের সাত লাখেরও বেশি কৃষকের মোট ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করেছে। সরকারের ঘোষিত কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত এই উদ্যোগকে কৃষি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ঋণের বোঝায় জর্জরিত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এটি নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের ৪৮টি জেলার মোট ৭ লাখ ৯ হাজার ৬৭৯ জন কৃষক এই ঋণ মওকুফ সুবিধার আওতায় এসেছেন। কৃষকদের তথ্য যাচাই-বাছাই, ঋণের হিসাব পর্যালোচনা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের চিহ্নিত করার পর ধাপে ধাপে এই কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। ব্যাংকটির দাবি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেই পুরো প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, বাজারের অস্থিরতা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিপুলসংখ্যক কৃষক নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। এর ফলে তাদের অনেকেই খেলাপি হয়ে পড়েন এবং নতুন করে কৃষিঋণ গ্রহণের সুযোগ হারান। ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে চলে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিএনপি সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানিয়েছিলেন, শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতের ক্ষুদ্র কৃষকেরা এই সুবিধা পাবেন। সরকারের লক্ষ্য ছিল কৃষকদের ওপর জমে থাকা ছোট অঙ্কের ঋণের বোঝা কমিয়ে তাদের পুনরায় উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনা।
সরকার ঘোষিত এই কর্মসূচির আওতায় মোট ১ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার কৃষিঋণ মওকুফের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ১২ লাখ কৃষক উপকৃত হওয়ার কথা। সেই পরিকল্পনার প্রায় ৩৯ শতাংশ এককভাবে বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির মতে, কৃষিঋণ বিতরণে দেশের অন্যতম প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের ওপর বড় দায়িত্ব ছিল এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কৃষিঋণের প্রায় ৬৩ শতাংশই এই ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। ফলে কৃষকদের আর্থিক পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ব্যাংকটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষকদের ঋণের চাপ কমানো গেলে তারা পুনরায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারবেন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সংগ্রহে নতুন ঋণ গ্রহণ করতে পারবেন। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সঞ্চিয়া বিনতে আলী বলেছেন, সরকারের নির্দেশনার আলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কৃষকদের তথ্য যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করে ঋণ মওকুফ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তিনি জানান, এই উদ্যোগের ফলে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ঋণের দায় থেকে মুক্ত হয়েছেন। একই সঙ্গে তারা ভবিষ্যতে নতুন করে কৃষিঋণ গ্রহণের সুযোগ পাবেন, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে সহায়ক হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষিঋণ মওকুফ শুধু আর্থিক সুবিধা নয়, এটি কৃষকদের জন্য একটি মানসিক স্বস্তিও নিয়ে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের দায়ে অনেক কৃষক সামাজিক ও আর্থিকভাবে নানা সমস্যার মুখোমুখি ছিলেন। নতুন করে ঋণ না পাওয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়া, চাষাবাদ সীমিত হয়ে পড়া এবং বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। ঋণ মওকুফের মাধ্যমে সেই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, শুধু ঋণ মওকুফ করলেই কৃষি খাতের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা দূর হবে না। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, সহজ শর্তে নতুন ঋণ বিতরণ, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মতো বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ কৃষিঋণ-সংক্রান্ত তথ্যও কৃষি ব্যাংকের কার্যক্রমের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ব্যাংকটির কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কিন্তু একই সময়ে তারা বিতরণ করেছে ৯ হাজার ৮১ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১ হাজার ২৮১ কোটি টাকা বেশি। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, কৃষি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারেও কৃষি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কৃষিঋণ মওকুফের পাশাপাশি ‘কৃষক কার্ড’ চালু, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রবর্তন, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার এবং প্রতিবছর ৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মতো কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন, সেচব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে কৃষিঋণ মওকুফের ইতিহাসও নতুন নয়। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের শাসনামলে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের আসল ও সুদ মওকুফের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রায় তিন দশক পর আবারও একই ধরনের একটি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হওয়ায় এটি কৃষি নীতির ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ মওকুফের ফলে ক্ষুদ্র কৃষকদের আর্থিক সক্ষমতা কিছুটা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে আরও টেকসই করতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষকদের নিয়মিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় ধরে রাখতে ঋণ বিতরণ ও আদায় ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো জরুরি।
সামগ্রিকভাবে পাঁচ মাসে ৬০৪ কোটি ৮১ লাখ টাকার কৃষিঋণ মওকুফ কর্মসূচি শুধু ঋণ অব্যাহতির একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি কৃষকদের নতুন করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী অবশিষ্ট কৃষকদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হলে দেশের কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।