প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী কুরমা চা বাগানে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি কার্যকর, চার সপ্তাহের বকেয়া মজুরি পরিশোধ এবং বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন চা শ্রমিকরা। বুধবার সকালে সাধারণ চা শ্রমিক, ছাত্র ও যুবকদের ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য মজুরি, শ্রমিক অধিকার এবং ইউনিয়নের গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় চা শিল্পের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত শ্রমিকরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।
সমাবেশে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের অভিযোগ, সংসদে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হলেও পরে সেটি প্রত্যাহার করা হয়। এ ঘটনায় চা শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের দাবি, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বিদ্যমান মজুরি দিয়ে একটি শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব নয়। ফলে সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাব বাস্তবায়নের মাধ্যমে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে।
বক্তারা বলেন, দেশের অন্যতম শ্রমনির্ভর শিল্প হিসেবে চা শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চায়ের সুনাম রয়েছে। অথচ এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার মূল শক্তি চা শ্রমিকরা এখনও ন্যায্য পারিশ্রমিক ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের ভাষ্য, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করেও শ্রমিকরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিকর খাদ্য কিংবা নিরাপদ আবাসনের মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছেন না।
সমাবেশে কুরমা চা বাগানের চলমান সংকট বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। বক্তাদের অভিযোগ, টানা চার সপ্তাহ ধরে বাগানের শ্রমিকদের মজুরি বন্ধ রয়েছে। এতে শত শত শ্রমিক পরিবার চরম মানবিক সংকটে পড়েছে। নিয়মিত আয় না থাকায় অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। শিশুদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে, অসুস্থ সদস্যদের চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে অনেক শ্রমিককে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। শ্রমিকদের ভাষ্য, পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে তাদের জীবনযাত্রা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে শ্রমিকরা কেবল বকেয়া চার সপ্তাহের মজুরি নয়, বাগানের শ্রমিকদের আইনসিদ্ধ সব পাওনা দ্রুত পরিশোধেরও দাবি জানান। তারা বলেন, শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের যেসব আর্থিক সুবিধা ও অধিকার নিশ্চিত করার কথা, বাস্তবে তার অনেকটাই তারা পাচ্ছেন না। এ অবস্থার দ্রুত অবসান ঘটিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সমাবেশে শ্রম বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তাদের দাবি, শ্রম অধিদপ্তরের কোনো ধরনের অযাচিত বা অবৈধ হস্তক্ষেপ ছাড়া ইউনিয়নের অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। তাদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে শ্রমিকরা নিজেদের প্রতিনিধিকে স্বাধীনভাবে নির্বাচিত করতে পারবেন এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ইউনিয়ন আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
বক্তারা আরও বলেন, চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ও সমস্যাগুলো নিয়ে নানা সময়ে আলোচনা হলেও বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তার প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে দেখা যায়নি। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং তাদের আস্থার সংকটও গভীর হচ্ছে। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, শ্রম অধিদপ্তর এবং চা শিল্প সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তব্য দেন চা শ্রমিক নারী নেত্রী গীতা রানী কানু, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল হক, শমশেরনগর চা বাগানের শ্রমিক নেত্রী লছমি রানী রাজভর, শ্রমিক নেতা সুজিত পাশাসহ আরও কয়েকজন স্থানীয় প্রতিনিধি। তারা বলেন, চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শ্রমিক নেতারা মনে করেন, শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক নিরাপত্তাসহ সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তারা বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলে চা শিল্পও আরও প্রতিযোগিতামূলক ও উৎপাদনমুখী হয়ে উঠবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের চা শিল্পে শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনমান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিভিন্ন সময়ে শ্রমিকদের আন্দোলন, আলোচনা ও সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে কিছু পরিবর্তন এলেও বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে মজুরি কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের সংগঠন পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করাও সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
সমাবেশ শেষে শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের দাবিগুলো পুনর্ব্যক্ত করেন এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তারা আশা প্রকাশ করেন, সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং বাগান মালিকপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে এগিয়ে আসবে। অন্যথায় শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলেও সমাবেশে ইঙ্গিত দেওয়া হয়।
চা শ্রমিকদের মতে, তাদের দাবি কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সম্মানজনক জীবনযাপনের ন্যূনতম অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। তাই দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি কার্যকর, বকেয়া মজুরি ও আইনসিদ্ধ পাওনা পরিশোধ এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ ইউনিয়ন নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটানোই এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।