এলোমেলো বাসে বাড়ছে যানজট, ঝুঁকিতে রাজধানীর সড়ক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ বার
এলোমেলো বাসে বাড়ছে যানজট, ঝুঁকিতে রাজধানীর সড়ক

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানী ঢাকার সড়কে প্রতিদিনের যানজট ও বিশৃঙ্খলা এখন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। কর্মব্যস্ত এই মহানগরে প্রতিদিন লাখো মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করে কর্মস্থল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রয়োজনীয় গন্তব্যে যাতায়াত করেন। কিন্তু সড়কে নেমেই তাদের পড়তে হয় এক অগোছালো পরিবহন ব্যবস্থার মুখোমুখি। একই রুটে একাধিক বাস কোম্পানির প্রতিযোগিতা, নির্ধারিত বাসস্টপ উপেক্ষা করে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন, সড়কের মাঝখানে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা এবং যাত্রী ধরতে একে অপরকে বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করার প্রবণতা রাজধানীর যান চলাচলকে আরও বিশৃঙ্খল করে তুলছে। এর ফলে শুধু যানজটই বাড়ছে না, প্রতিনিয়ত বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।

রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কগুলোতে প্রতিদিন দেখা যায়, বাসচালকরা নির্দিষ্ট স্টপেজে না থেমে যেখানে যাত্রী দেখছেন, সেখানেই বাস থামিয়ে দিচ্ছেন। কখনও রাস্তার মাঝখানে, কখনও মোড়ের মুখে, আবার কখনও একাধিক লেন দখল করে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে। এতে পেছনের যানবাহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অফিস শুরুর সময় এবং বিকেলের ব্যস্ত সময়ে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, একই রুটে অসংখ্য বাস কোম্পানি পরিচালিত হওয়ায় যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা ক্রমেই অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠেছে। নির্ধারিত সময়সূচি বা যাত্রীসেবার পরিবর্তে অধিক যাত্রী সংগ্রহই হয়ে উঠেছে অনেক বাসচালক ও হেলপারের প্রধান লক্ষ্য। ফলে সামনে থাকা বাসকে অতিক্রম করার চেষ্টা, হঠাৎ গতি কমানো, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা কিংবা দ্রুত লেন পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ প্রতিদিনই ঘটছে।

এই বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতার কারণে অতীতেও একাধিক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুই বাসের চাপায় যাত্রীর হাত হারানো, যাত্রী তুলতে গিয়ে ফুটপাতে উঠে শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া কিংবা ভাড়া নিয়ে বাগ্‌বিতণ্ডার জেরে চলন্ত বাস থেকে যাত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনা দেশের মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব দুর্ঘটনার প্রতিবাদে বিভিন্ন সময়ে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন হয়েছে, নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন হয়েছে, কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ যাত্রীদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার মূল সংকটের একটি হলো রুটভিত্তিক সমন্বয়ের অভাব। একই রুটে অসংখ্য কোম্পানির বাস চলাচল করায় যাত্রী সংগ্রহকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। এই প্রতিযোগিতা থেকেই জন্ম নেয় বেপরোয়া চালনা, অনিয়ন্ত্রিত লেন পরিবর্তন এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা। এর প্রভাব পড়ে পুরো সড়ক ব্যবস্থায় এবং যান চলাচলের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়।

ঢাকার সড়কে আরেকটি বড় সমস্যা হলো নির্ধারিত বাসস্টপ ব্যবহারে অনীহা। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরাও সুবিধাজনক স্থানে বাস থামানোর অনুরোধ করেন এবং বাসচালকরাও তা মেনে নেন। ফলে নির্ধারিত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাসস্টপের বাইরে যাত্রী ওঠানামার প্রবণতা বেড়েছে। এতে শুধু যানজট নয়, পথচারী ও যাত্রীদের জন্যও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

রাজধানীর সড়কে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেল, রিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং অন্যান্য যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করে। এই মিশ্র যানবাহন ব্যবস্থার মধ্যে বড় আকারের বাস যখন হঠাৎ লেন পরিবর্তন করে বা রাস্তার মাঝখানে থেমে যায়, তখন পুরো যানপ্রবাহ ব্যাহত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার মতো বৈচিত্র্যময় যানবাহনের শহরে আন্তর্জাতিক মানের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অতীতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। রাজধানীর কয়েকটি রুটে লাল-সবুজ নগর পরিবহন ও গোলাপি রঙের বাস চালু করা হয়। পরে রুট ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাস পরিচালনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়। ২০১৬ সাল থেকে এই প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু হলেও প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসেনি। ফলে বাস পরিচালনায় একক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সামছুল হক মনে করেন, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাঁর মতে, পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে পথচারী ও গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করে উন্নত, নিরাপদ ও সময়নিষ্ঠ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৪০টি নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু সড়কের পরিমাণ বাড়ছে না। ফলে যানজট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে এবং যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে রাস্তা সম্প্রসারণের পাশাপাশি অধিক যাত্রী পরিবহনে সক্ষম ডাবলডেকার বাস চালু এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবহন পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

গবেষকরা মনে করেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, পরিবহন খাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, চালক ও হেলপারদের প্রশিক্ষণ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং যাত্রীদের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। একই সঙ্গে বাস পরিচালনায় ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা, নির্ধারিত সময়সূচি এবং রুটভিত্তিক সমন্বিত ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে শুধু নতুন আইন প্রণয়ন নয়, সেই আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং পরিবহন মালিক, চালক ও যাত্রী—সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে একটি দক্ষ, নিরাপদ ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা অপরিহার্য। প্রতিদিনের যানজট, বিশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রমাণ করছে যে বর্তমান ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তাই রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও টেকসই করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও নগরবাসী।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত