প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার মানুষের কাছে বর্ষাকাল যেন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের ঋতু নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের আরেক নাম। ভারী বর্ষণ কিংবা ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল শুরু হলেই তলিয়ে যায় তাহিরপুর-বিশ্বম্ভরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অংশ। পানির নিচে ডুবে যায় সেতুর সংযোগ সড়ক ও কজওয়ে। ফলে তিন উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ কার্যত সড়ক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ এবং পর্যটন—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগ চললেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্ষা এলেই এই দুর্ভোগ যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মাসের পর মাস সড়কের বিভিন্ন অংশ ডুবে থাকে। ফলে সড়কপথে চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও মধ্যনগরের বাসিন্দাদের জরুরি প্রয়োজনেও গন্তব্যে পৌঁছাতে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার নৌকা বদলে যাতায়াত করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
তাহিরপুর-বিশ্বম্ভরপুর-সুনামগঞ্জ সড়কটি জেলার এই তিন উপজেলার মানুষের জন্য একমাত্র প্রধান সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের একটি অংশ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং বাকি অংশ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অধীনে রয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুবিধার্থে বিভিন্ন স্থানে কজওয়ে নির্মাণ করা হলেও বর্ষা মৌসুমে সেই কজওয়েগুলোই এখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ার সেতুর পূর্ব পাশ, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শক্তিয়ারখলা বাজার এলাকা এবং দুর্গাপুর মোকামবাড়ি সংলগ্ন অংশে সড়ক দীর্ঘ সময় পানির নিচে ডুবে থাকে। পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোত থেমে গেলেও হাওরের পানির উচ্চতা সড়কের চেয়ে বেশি থাকায় এসব এলাকায় পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে কয়েক মাস ধরে সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।
এ অবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষা ও কর্মজীবনের ওপর। তাহিরপুর আলিম মাদ্রাসার প্রভাষক আসিকুর রহমান জানান, চাকরির প্রয়োজনে প্রতিদিন বিশ্বম্ভরপুর থেকে তাহিরপুরে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু বর্ষাকালে একই পথ পাড়ি দিতে দুইবার নৌকা বদল করতে হয়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, তেমনি প্রতিদিন বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়। একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থী, সরকারি কর্মকর্তা, স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষ।
সড়ক অচল হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। অটোরিকশাচালক বিজন দাস বলেন, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সরাসরি সুনামগঞ্জে যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। দুর্গাপুর মোকামবাড়ি এলাকায় এখনও প্রায় চার ফুট পানি থাকায় যানবাহন চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে পরিবহন চালকদের আয় কমে গেছে, যাত্রীদেরও অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর প্রভাব সুস্পষ্ট। বর্ষাকালে কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় হওয়ায় স্থানীয় বাজারেও মূল্য বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
বিশ্বখ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওরে আগত পর্যটকদেরও এই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পর্যটক টুটুল আহমেদ জানান, বর্ষাকালে সড়ক ডুবে থাকায় সরাসরি গাড়িতে তাহিরপুর পৌঁছানো যায় না। ফলে সুনামগঞ্জ শহর থেকেই হাউসবোট বা নৌযানে যাত্রা শুরু করতে হয়। এতে অন্তত তিন ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয় এবং ভ্রমণ ব্যয়ও বেড়ে যায়। স্থানীয় পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় অনেক পর্যটক ভ্রমণ পরিকল্পনা বাতিল করেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে স্থানীয় অর্থনীতিতে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, সমস্যার মূল কারণ হলো সড়কের কয়েকটি অংশ আশপাশের এলাকার তুলনায় অনেক নিচু অবস্থানে রয়েছে। বালিজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন বলেন, প্রায় ৩০০ মিটার সড়ক এতটাই নিচু যে পাহাড়ি ঢলের পানি চলে যাওয়ার পরও পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়ে ডুবে থাকে। তিনি মনে করেন, এসব অংশ উঁচু করা এবং পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গড়ে তুললেই দীর্ঘদিনের এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
সম্প্রতি সড়কটির দুরবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক। পরিদর্শনের সময় প্রয়োজনীয় কালভার্ট নির্মাণ এবং সড়কের দুই পাশের সীমানা নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছবাব মিয়া। স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রশাসনের এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে আগামী মৌসুমে দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে।
তবে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যার পেছনে আইনি জটিলতাও বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, শক্তিয়ারখলা এলাকায় অতীতে পাহাড়ি ঢলের প্রবল স্রোতে পাকা রাস্তা বারবার ভেঙে যেত। সেই কারণে অধিদপ্তরের নির্দেশে সেখানে কজওয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। পরে ২০১২ সালে এক ঠিকাদার প্রায় ২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে এলজিইডির বিরুদ্ধে মামলা করেন। সেই মামলার জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, শুধু অস্থায়ী মেরামত নয়, পুরো সড়কটির জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উঁচু সড়ক নির্মাণ, আধুনিক কালভার্ট ও সেতু বৃদ্ধি, উন্নত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকৌশল পরিকল্পনা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বর্ষাকালে জরুরি নৌযান সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার উদ্যোগও প্রয়োজন।
হাওরাঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে তাদের জীবন যেন থমকে যায়। শিশুদের স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে কৃষকের ফসল বাজারে পৌঁছানো, রোগীর হাসপাতালে যাওয়া কিংবা পর্যটকদের গন্তব্যে পৌঁছানো—সব ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হয় অনিশ্চয়তা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই অবহেলার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন শুধু একটি সড়কের উন্নয়ন নয়, বরং পাঁচ লাখ মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।