ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির প্রার্থী বাছাইয়ে চমকের আভাস

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
  • ৫ বার
ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির প্রার্থী বাছাইয়ে চমকের আভাস

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জোর প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলীয় সূত্র বলছে, এবার শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয়তা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনসম্পৃক্ততাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী নির্বাচন করা হবে। এ কারণে দুই সিটিতেই নতুন মুখ এবং চমকপ্রদ প্রার্থী আসতে পারেন বলে জোর আলোচনা চলছে।

দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংগঠনকে সক্রিয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের মাঠে কাজ শুরু করার সবুজ সংকেতও দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি ইতোমধ্যে একাধিক জরিপ পরিচালনা করেছে। বিভিন্ন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্বতন্ত্র জরিপ সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত এসব জরিপে সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক অবস্থান এবং জনমত মূল্যায়ন করা হয়েছে। শুধু একটি জরিপের ওপর নির্ভর না করে নির্বাচন পর্যন্ত আরও কয়েক দফা জরিপ চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।

গত ৪ জুলাই গুলশানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা জেলা বিএনপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি এবং কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তারেক রহমান। পরে ১১ জুলাই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে জাতীয় নির্বাচনের পর সংগঠনের কার্যক্রম কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ার কারণ, তৃণমূলের সক্রিয়তা, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান জানতে চান কেন জাতীয় নির্বাচনের পর সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি কমেছে এবং কীভাবে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও কর্মীদের সক্রিয় করা যায়। একই সঙ্গে তিনি দুই সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের বিষয়ে নেতাদের মতামতও জানতে চান। জবাবে মহানগরের নেতারা জানান, দীর্ঘদিন বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকায় নেতাকর্মীদের মধ্যে কিছুটা স্থবিরতা এসেছে। তবে নির্বাচন সামনে এলে সবাই আবার মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠবেন।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে কোনো ধরনের তদবির, ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা স্বজনপ্রীতির সুযোগ রাখা হবে না। প্রার্থী নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ যোগ্যতা, জনপ্রিয়তা এবং জনগণের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে। দলীয় চেয়ারম্যানও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে কাউকে বিজয়ী করার কোনো চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। বরং জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির প্রার্থীদেরই সমর্থন দেওয়া হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে এবার নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২০ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন ইশরাক হোসেন। এর আগে ২০১৫ সালে দলটির প্রার্থী ছিলেন মির্জা আব্বাস। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইশরাক হোসেন মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ায় এবং জরিপে তাঁকে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কম সম্পৃক্ত হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি। অন্যদিকে মির্জা আব্বাস দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তাঁর নামও আলোচনার বাইরে রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ সিটিতে অপেক্ষাকৃত তরুণ, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং জনসম্পৃক্ত কোনো নেতাকে প্রার্থী করার বিষয়ে দলের ভেতরে ইতিবাচক আলোচনা চলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, জামায়াত ও এনসিপির মতো দলগুলো যদি তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনে, তাহলে বিএনপিও নতুন প্রজন্মের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে নতুন মুখের ওপর আস্থা রাখতে পারে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনেও একই ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। ২০১৫ ও ২০২০ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন তাবিথ আউয়াল। তবে দলীয় সূত্রের দাবি, এবার তাঁকে নয়, অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের নাম। জরিপেও তিনি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছেন বলে জানা গেছে। যদিও এ বিষয়ে বিএনপির কোনো নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

শুধু মেয়র পদ নয়, রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তারেক রহমান। মহানগরের নেতাদের কাছ থেকে সাংগঠনিকভাবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব তালিকা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে। দলীয় সূত্র বলছে, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওয়ার্ড পর্যায়েও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বিএনপি।

এদিকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রস্তুতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিএনপি। বিশেষ করে জামায়াত এক বছর আগে থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঠে সক্রিয় করেছে বলে দলটির নেতারা মনে করছেন। ফলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়তে আগেভাগেই প্রার্থী চূড়ান্ত করার কৌশল নিয়েছে বিএনপি।

তবে দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, বিভিন্ন এলাকায় একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয় থাকায় কোথাও কোথাও কর্মীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। কে শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পাবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অনেক নেতাকর্মী দ্বিধায় রয়েছেন। এজন্য দ্রুত প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে সাংগঠনিক ঐক্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও জানিয়েছেন, একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সব সময় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। তবে নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করলেই দল পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচন নয়, জাতীয় রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে। তাই প্রার্থী নির্বাচনে বিএনপির কৌশল, নতুন মুখের সম্ভাবনা এবং জরিপভিত্তিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হলে রাজধানীর নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত