প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সমাজে নারীদের ওপর চলা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা, শ্লীলতাহানি, যৌন নিপীড়ন এবং লোমহর্ষক নারী হত্যার ঘটনা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে, যা বিবেকবান মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত ঘটে চলা এসব মর্মান্তিক ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী ও তাদের পরিবার আইনি লড়াই বা মামলা দায়ের করলেও অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার ও সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা কিংবা অভিযোগ দায়ের করার পরও মূল অভিযুক্তরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ায় সমাজে অপরাধের প্রবণতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও মাঠপর্যায়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগের চরম ঘাটতি রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তার অনুভূতি দিন দিন ম্লান হয়ে আসছে এবং অপরাধীরা একধরনের নির্বিঘ্ন পরিবেশের সুযোগ নিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় ঘটে যাওয়া একটি পৈশাচিক ঘটনা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। সেখানে বিবাহবিচ্ছেদের দীর্ঘ ক্ষোভ ও বিরোধের জেরে সাবেক স্ত্রীর শরীরে প্রকাশ্যে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করেছে এক পাষণ্ড সাবেক স্বামী। নিহত সুমাইয়া আক্তার শ্যামলীর গ্রামের বাড়িতে ঢুকে এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত মাহবুবুর রহমানকে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় পুলিশ আটক করতে সক্ষম হয়। এই লোমহর্ষক ঘটনায় নিহতের পরিবার শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে এবং তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন। অন্যদিকে, নরসিংদীতে পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যার অপরাধে এক ব্যক্তিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেছে বিজ্ঞ আদালত। নরসিংদী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন, যা কিছুটা হলেও আইনি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে।
তবে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক পরিসরে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে অব্যাহত রয়েছে। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় চতুর্থ শ্রেণির এক কোমলমতি শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে এক প্রতিবেশীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনেছে। একইভাবে গাজীপুরের টঙ্গীতে এক মাদ্রাসার ভেতরে নয় বছরের দুই শিশু শিক্ষার্থীকে শ্লীলতাহানি ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ইব্রাহিম খলিল নামের এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এ ধরনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে শিশুদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসার মতো নিরাপদ স্থানগুলোতেও আজ তারা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও যৌন হয়রানির গুরুতর অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় এক অধ্যাপককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং অপর এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন কঠোর পদক্ষেপ কিছুটা স্বস্তি আনলেও সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে আরও কঠোর নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে।
ভোলার চরফ্যাশনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি কক্ষে এক নারীকে শ্লীলতাহানির চেষ্টার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে এক অফিস সহকারীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী নারীর সাহসী ও জোরালো প্রতিবাদের কারণে লম্পট সেই কর্মচারী তার অসৎ উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয় এবং পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে দপ্তরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। একইভাবে বরিশালের বাবুগঞ্জে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে শ্লীলতাহানি ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে প্রভাবশালী মহলের চরম হুমকি ও বাধা উপেক্ষা করে আদালতে মামলা দায়ের করতে বাধ্য হয়েছেন ভুক্তভোগী নারী। স্থানীয় প্রভাবশালীরা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও আদালতের কঠোর নির্দেশে শেষ পর্যন্ত থানায় নিয়মিত মামলা রেকর্ড করা হয়। নেত্রকোনার বারহাট্টায় এক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী তরুণীকে প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফরিদপুরের নগরকান্দায় রেললাইনের পাশ থেকে এক শিশুর মরদেহ উদ্ধারের পর তাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। যশোরের চৌগাছায় ছাত্রদলের এক নেতার বিরুদ্ধে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বগুড়ার গাবতলীতে এক সন্তানের জননীর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন পালিয়ে যাওয়ায় পুরো বিষয়টি নিয়ে নানা রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এই সমস্ত বিচ্ছিন্ন অথচ ধারাবাহিক অপরাধের চিত্র স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে সমাজে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। কেবল বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি মামলার বিচার কার্য সম্পন্ন করলেই এই গভীর সামাজিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরাধীদের মনে আইনের ভয় সৃষ্টি করতে হলে মামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা চিরতরে দূর করতে হবে। পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও অপরাধপ্রবণতা দূর করতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি কঠোর নজরদারি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা না যায়, তবে নারী ও শিশুদের ওপর এই নির্মম নির্যাতন ও সহিংসতার মাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে, যা কোনোভাবেই একটি সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না।