প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের অর্থনীতি যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপ এবং সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়বৃদ্ধির কারণে চরম এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর জন্য বারবার মরিয়া হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি। সরকারের তরফ থেকে বারবার দাম বাড়ানোর বিষয়টি শক্তভাবে নাকচ করে দেওয়া সত্ত্বেও সংস্থাটি যেন এ বিষয়ে আদাজল খেয়ে নেমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের সামান্য ওঠানামার অজুহাত দেখিয়ে প্রতি মাসেই দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বাড়ানোর একের পর এক প্রস্তাব পাঠিয়ে চলেছে তারা, যা দেশের সচেতন মহল এবং সাধারণ মানুষের মাঝে চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
চলতি বছরের জুলাই মাসের সর্বশেষ প্রস্তাবে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১১৫ টাকা থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ১৫৪ টাকা করার অবাস্তব সুপারিশ করা হয়েছে। এর আগে গত মে মাসে পাঠানো এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাবে বিপিসি ডিজেলের দাম প্রতি লিটার সরাসরি ২৩৫ টাকা করার সুপারিশ করেছিল, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। শুধু তাই নয়, যদি এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দাম সমন্বয় করা সম্ভব না হয়, তবে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাকে সরকারের পক্ষ থেকে ১২ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়ার জন্য জোর দাবি জানানো হয়েছে। একের পর এক এমন অস্বাভাবিক ও জনবিরোধী প্রস্তাব পাঠানোর মাধ্যমে বিপিসি আসলে কী হাসিল করতে চাইছে, তা নিয়ে এখন চারদিকে নানা ধরনের গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস ওঠা জীবনযাত্রা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কঠিন বাস্তবতা বিবেচনা করে আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের পরিকল্পনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে। সম্প্রতি দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন যে, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং বাজারের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সরকার তেলের দামের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক ও জনবান্ধব অবস্থান বজায় রেখেছে। তবে বিপিসির এই ধারাবাহিক ও জেদি দর বাড়ানোর প্রস্তাব নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণের অস্বচ্ছ পদ্ধতি এবং তাদের লাভ-লোকসানের দীর্ঘমেয়াদি হিসাব-নিকাশ নিয়ে।
জ্বালানি খাতের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, অতيم বছরগুলোতে বিপিসি কোটি কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করলেও সেই লাভের একটি নির্দিষ্ট অংশ দিয়ে যদি কোনো আপৎকালীন বা জরুরি তহবিল বা ইমার্জেন্সি ফান্ড গঠন করা হতো, তবে আজকের এই সামান্য বিশ্ববাজারের অস্থিরতার সময় বারবার দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়ার কোনো প্রয়োজনই হতো না। তা ছাড়া বিপিসির আর্থিক হিসাব-নিকাশের স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষার চরম অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের গুরুতর অসন্তোষ ও অভিযোগ রয়েছে। প্রতি মাসের বিশ থেকে একুশ তারিখের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারদর পর্যালোচনার নামে তারা যে কারসাজিমূলক প্রস্তাব পাঠায়, তার পেছনে বড় ধরনের অসৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ বছরের বিভিন্ন মাসের প্রস্তাবগুলোর দিকে নজর দিলে বিপিসির এই অস্থির নীতির এক স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে। গত এপ্রিল মাসের প্রস্তাবে প্রতি লিটার ডিজেল ১৫৬ টাকা, অকটেন ১৪৯ টাকা, পেট্রোল ১৪৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৪১ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছিল। সে সময় সরকার জনস্বার্থে দাম অপরিবর্তিত রাখলেও পরবর্তীতে ১৯ এপ্রিল কিছুটা সমন্বয় করে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু মে মাসেই আবার হুট করে ডিজেল ২৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৬ টাকা, পেট্রোল ১৬২ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৮ টাকা করার অতিসত্বর সুপারিশ করে বিপিসি। সরকারের পক্ষ থেকে তা আবারও প্রত্যাখ্যান করা হয়। জুনের প্রস্তাবে ডিজেল ১৭৬ টাকা, অকটেন ১৬১ টাকা করার কথা বলা হলেও সরকার শুধু অন্য তেলের দাম পাঁচ টাকা বাড়িয়ে ডিজেল অপরিবর্তিত রাখে। সর্বশেষ জুলাই মাসের প্রস্তাবেও শুধু ডিজেলের দাম ১৫৪ টাকা করার কথা বলা হলেও সরকার এবং আগস্ট মাসেও দাম বাড়ানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
বিপিসির পরিচালক অর্থ ও সরকারের যুগ্ম সচিব নাজনীন পারভীন অবশ্য দাবি করেছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চড়া থাকায় তাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, অথচ সরকার নির্ধারিত কম দামে বিক্রি করায় বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। অতীতে সংরক্ষিত অর্থ থেকেই নাকি এখন আমদানি খরচ মেটানো হচ্ছে। সংস্থাটির মনগড়া হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত মূল্য সমন্বয় না করায় তাদের প্রায় ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে নাকি প্রায় কুড়ি হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। তবে বিপিসির এই হিসাবের সত্যতা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন দেশের জ্বালানি গবেষকরা। তাদের স্পষ্ট কথা হলো, বিপিসি যাকে ঘাটতি বলে প্রচার করছে, তার সিংহভাগই অতীতে লুটেপুটে খাওয়া বা অর্জিত উদ্বৃত্ত অর্থ থেকেই সমন্বয় করা সম্ভব। নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ছাড়া এই দাবির কোনো যৌক্তিকতা নেই।
বিপিসির অতীতের আর্থিক প্রতিবেদনগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধ মুনাফা করেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ধারাবাহিকভাবে লাভ করতে শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ৫১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা বিশাল মুনাফা করেছে। অর্থাৎ এই সুদীর্ঘ সময়ে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি নিট লাভ করেছে তারা। এর মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনা মহামারির চরম দুর্দিনে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন রেকর্ড পরিমাণে কমে গিয়েছিল, তখন বিপিসির মুনাফা এক লাফে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৯২ কোটি টাকায়, যা তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এর পরের বছরগুলোতেও হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ করার পরও বারবার লোকসানের কান্নাসুরে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের বা ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন যে, বিপিসির আর্থিক হিসাবের ভেতরে কোনো ধরনের স্বচ্ছতা নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার স্বাধীন ও মানসম্মত নিরীক্ষার প্রস্তাব দিলেও নানা অজুহাতে তা এড়িয়ে যাওয়া হয়। একদিকে তারা প্রতিনিয়ত লোকসানের কথা বলে কান্নাকাটি করে, অন্যদিকে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত লাখ লাখ টাকা বোনাস ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বিপিসির নিজস্ব সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে এর প্রকৃত সুফল বা কুফল সাধারণ মানুষকেই ভোগ করতে হচ্ছে। ড. ইজাজ হোসেনের মতো প্রখ্যাত জ্বালানি বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন যে, তেলের দাম নির্ধারণের স্বয়ংক্রিয় ফর্মুলায় মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যাই হোক না কেন, বিপিসির মুনাফা করার সুযোগ সবসময়ই নিশ্চিত করা থাকে। এই স্বেচ্ছাচারী নীতি বন্ধ করে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার্থে সরকারকে অবিলম্বে আরও কঠোর ও জনবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে।