রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী মির্জা ফখরুল, জোটের প্রার্থী কর্নেল অলি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী মির্জা ফখরুল, জোটের প্রার্থী কর্নেল অলি
প্রকাশ: ১০ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ। ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই পদের জন্য সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ধারা ভেঙে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রমকে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফলে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ ভোট হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, আগামী ১৩ আগস্টের মধ্যে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর মনোনয়নপত্রগুলোর যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হবে এবং ১৮ আগস্ট পর্যন্ত প্রার্থীরা তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে পারবেন। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের মূল অধিবেশন কক্ষে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে সংসদ সদস্যরা সরাসরি ভোট দিয়ে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। চট্টগ্রাম-৪ আসনটি বর্তমানে শূন্য থাকায় ৩৪৯ সদস্যের বর্তমান জাতীয় সংসদে একজন প্রার্থীর বিজয়ের জন্য অন্তত ১৭৫টি ভোটের প্রয়োজন হবে। সংসদে বিএনপির নিজস্ব সংসদ সদস্য রয়েছে ২৪৭ জন এবং জামায়াত জোটের সংসদ সদস্য সংখ্যা ৯০। যেহেতু ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে প্রকাশ্য ব্যালটের মাধ্যমে এবং দলীয় শৃঙ্খলার কারণে দলের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ সংসদ সদস্যদের নেই, তাই বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর বিজয় কার্যত সুনিশ্চিত বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনোনীত করায় সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের পর সেবারই প্রথম ও শেষবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস প্রয়োজনীয় ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছিলেন। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৫ বছর, যার মধ্যে প্রতিটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসছেন। তবে এবার ১১ দলীয় ঐক্য থেকে সুনির্দিষ্ট প্রার্থী ঘোষণা করায় সেই ধারা ভাঙতে চলেছে এবং একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে।
রোববার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কার্যালয় থেকে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবীর রিজভী বিএনপির পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, একই ব্যক্তির নামে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানের আইনি বিধান রয়েছে, যাতে একটি ফরমে কোনো ধরনের ভুলত্রুটি থাকলে অন্যটি বিকল্প হিসেবে বিবেচনায় রাখা যায়। বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনের সময়ও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল।
বিএনপির অন্দরে ও রাজনৈতিক মহলে একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতার পাশাপাশি শিক্ষাবিদ ও অভিজ্ঞ সরকারি আমলাদের নাম কিছুটা আলোচিত হলেও শেষ পর্যন্ত দলের বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাওয়ার গুঞ্জন সবচেয়ে বেশি ডালপালা মেলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করেন, বিএনপির দুর্দিনে যিনি সামনে থেকে দলকে অটুট ও ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন, সেই মির্জা ফখরুল পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এবং মার্জিত রাজনৈতিক আচরণের কারণে বিরোধী শিবিরের কাছেও সমানভাবে সমাদৃত। এছাড়াও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আব্দুল মঈন খানের নামও আলোচনায় রয়েছে। তবে দলের তরফ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে জানান যে, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না এবং দলীয়ভাবে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানানো হয়নি।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে মিন্টো রোডের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। বৈঠক শেষে কর্নেল অলি আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি একজন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা, যার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে কোনো দুর্নীতির কালিমা বা শিক্ষাগত যোগ্যতার বিতর্ক নেই। তিনি জানান, বর্তমান রাজনৈতিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের অভিভাবকত্ব গ্রহণের উপযুক্ত প্রতিনিধি হিসেবে জোটের সবাই তাকে এই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন।
সংসদের বর্তমান আসন বিন্যাসের সমীকরণে বিরোধী জোটের একক সংখ্যাগত শক্তি না থাকায় বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও কেন এই প্রার্থীতা—এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য রক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে সর্বদা অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক রাখতেই তারা এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন যে, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি যথাযথ সদিচ্ছা দেখায়নি। তার মতে, যদি সংস্কারের পথ ধরে সঠিক উদ্যোগ নেওয়া হতো, তবে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল মিলে ঐক্যমতের ভিত্তিতে একজন সর্বসম্মত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী নির্বাচন করা সম্ভব হতো। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও জোটের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত প্রার্থীর সুচারুভাবে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে এবং ছয়টি পৃথক কমিটি গঠন করে অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব কমিটিকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশের এই সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন উৎসবমুখর ও টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত