সরকারি আবাসিক ভবনে ৭ সদস্যের ব্যবস্থাপনা কমিটি

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৮ বার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি আবাসিক ভবনগুলোর নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও সুসংগঠিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর। পরিদপ্তরের ব্যবস্থাপনাধীন সরকারি আবাসিক এলাকার প্রতিটি ভবনে সাত সদস্যের ‘ভবন ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভবনের বাসিন্দাদের মধ্য থেকেই সরাসরি ভোটের মাধ্যমে এ কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে এক বছর।

সোমবার সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের পরিচালক (যুগ্মসচিব) মো. জহিরুল ইসলাম খানের স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। সরকারি আবাসিক ভবনে বসবাসকারী কর্মচারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবনের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও সমন্বয় বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়।

নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি সরকারি আবাসিক ভবনে বরাদ্দপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের মধ্য থেকে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে সাত সদস্যের ব্যবস্থাপনা কমিটি নির্বাচন করতে হবে। কোনো কারণে ভোটগ্রহণ আয়োজন করা সম্ভব না হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বরাদ্দপ্রাপকদের সম্মতির ভিত্তিতেও কমিটি নির্বাচন করা যাবে। অর্থাৎ ভবনের ব্যবস্থাপনা কাঠামোয় বাইরের কাউকে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়নি।

কমিটির সাতটি পদও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এতে একজন সভাপতি, একজন সাধারণ সম্পাদক, একজন অর্থ সম্পাদক, একজন নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা সম্পাদক, একজন মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা এবং দুজন কার্যকরী সদস্য থাকবেন। এর ফলে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার মতো দৈনন্দিন বিষয়গুলোর পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং নারী বাসিন্দাদের সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোও কমিটির দায়িত্বের আওতায় আসবে।

সরকারি আবাসিক ভবনগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বাসিন্দাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন দেখা দেয়। ভবনের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, সাধারণ স্থান ব্যবহার, বিভিন্ন ছোটখাটো সমস্যা এবং বাসিন্দাদের পারস্পরিক সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে একটি নির্দিষ্ট প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। নতুন কমিটি সেই দায়িত্ব পালনে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে কমিটির সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্তও রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ভবনে সরকারি আবাসন পরিদপ্তর থেকে বাসা বরাদ্দ পাওয়া সরকারি কর্মচারী ছাড়া অন্য কেউ ভবন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য হতে পারবেন না। ফলে ভবনের বাইরে থাকা কোনো ব্যক্তি বা সরকারি আবাসনের বরাদ্দপ্রাপক নন—এমন কাউকে কমিটির দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

নির্দেশনায় সরকারি আবাসিক এলাকার শৃঙ্খলা ও ব্যবহারবিধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘বাংলাদেশ এলোকেশন রুলস, ১৯৮২’-এর পরিপন্থী কোনো কার্যক্রম সরকারি আবাসনের ভেতরে করা যাবে না। একই সঙ্গে অননুমোদিত স্থাপনা নির্মাণ, একাডেমি, সংঘ বা ক্লাব স্থাপনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

সরকারি আবাসিক এলাকা মূলত সরকারি কর্মচারীদের বসবাসের জন্য নির্ধারিত। ফলে আবাসিক ভবনের জায়গা বা সাধারণ সুবিধাগুলো যেন আবাসিক ব্যবহারের বাইরে অন্য কোনো কাজে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়টি নতুন নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে। অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের স্থাপনা বা সংগঠন গড়ে উঠলে তা আবাসিক এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে—এমন বিবেচনা থেকেই বিধিনিষেধগুলো আরোপ করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও রয়েছে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা। সরকারি আবাসিক এলাকায় রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। একইভাবে বহিরাগত ব্যক্তিদের নিয়ে সাংগঠনিক সভা আয়োজন কিংবা শান্তি ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী কোনো কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ফলে আবাসিক ভবনকে মূলত বসবাস ও সংশ্লিষ্ট বৈধ আবাসিক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার নীতিই জোরদার করা হয়েছে।

এ ধরনের বিধিনিষেধের অন্যতম উদ্দেশ্য সরকারি আবাসিক এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা। একই ভবনে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একাধিক পরিবার বসবাস করেন। সেখানে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড কিংবা বহিরাগতদের নিয়মিত আনাগোনা বাড়লে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। নতুন নির্দেশনায় এসব ঝুঁকি কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে ভবন ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে না। আদেশে বলা হয়েছে, কমিটি গঠনের পর কার্যক্রম শুরু করার আগে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের অনুমোদন নিতে হবে। অর্থাৎ নির্বাচিত কমিটির ওপর স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব দেওয়া হলেও এর কার্যক্রম থাকবে সরকারি আবাসন কর্তৃপক্ষের তদারকির আওতায়।

কমিটি গঠন এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং কমিটির সভাপতিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা ভবন ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন এবং সেটি সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের অনুমোদনের ব্যবস্থা করবেন। এর মাধ্যমে ভবন পর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক তদারকির মধ্যে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় অর্থ সম্পাদকের পদ রাখার বিষয়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। ভবন ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনে কোনো বৈধ ও অনুমোদিত ব্যয় হলে তার হিসাব সংরক্ষণ এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখার প্রয়োজন রয়েছে। একইভাবে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা সম্পাদকের পৃথক পদ রাখায় ভবনের দৈনন্দিন পরিবেশ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

নারী বাসিন্দাদের বিষয়গুলো দেখভালের জন্য মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকার পদ রাখার মধ্য দিয়ে আবাসিক ব্যবস্থাপনায় নারীদের নির্দিষ্ট কিছু প্রয়োজন ও সমস্যার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আর দুজন কার্যকরী সদস্য কমিটির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন ও সমন্বয়ের কাজে সহযোগিতা করবেন।

এক বছরের মেয়াদ নির্ধারণের ফলে একই কমিটি দীর্ঘ সময় ধরে ভবনের ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পাবে না। নিয়মিত পরিবর্তনের মাধ্যমে ভবনের বিভিন্ন বরাদ্দপ্রাপককে ব্যবস্থাপনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে নির্বাচন কতটা স্বচ্ছভাবে হচ্ছে এবং কমিটি বাস্তবে কতটা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছে তার ওপর।

সরকারি আবাসিক ভবনের ব্যবস্থাপনা সাধারণ কোনো আবাসিক কমিটির মতো নয়। এখানে বসবাসকারীরা সবাই সরকারি কর্মচারী এবং ভবনগুলো সরকারি সম্পত্তির অংশ। তাই নিরাপত্তা, সম্পত্তির সঠিক ব্যবহার, শৃঙ্খলা এবং সরকারি বিধিবিধান অনুসরণের বিষয়গুলো সরাসরি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। নতুন নির্দেশনায় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের তদারকি—দুই দিককেই এক কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবন ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় হলে ছোটখাটো সমস্যা সমাধানে সমন্বয় বাড়তে পারে এবং বাসিন্দাদের মধ্যে দায়িত্ববোধও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছানো সহজ হতে পারে। তবে কমিটির দায়িত্ব, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুস্পষ্টতা বজায় রাখা জরুরি হবে।

সবশেষে বলা যায়, সরকারি আবাসিক ভবনগুলোর ব্যবস্থাপনায় নতুন এই কাঠামো শুধু কমিটি গঠনের প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; বরং আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা এবং অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনার দিকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ। ভবনভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের অনুমোদন ও কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারলে সরকারি আবাসিক এলাকাগুলোতে আরও সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত