রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গাজী নজরুলের ভোটাধিকার নিয়ে যা বললেন

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আসন্ন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির বলেছেন, সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। তাঁর যুক্তি, গাজী নজরুল ইসলাম বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও ভোট দেওয়ার অধিকার সংসদ সদস্যদের ওপরই ন্যস্ত।

রোববার (৯ আগস্ট) হাইকোর্টের অ্যানেক্স ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে শিশির মনির এ কথা বলেন। একই আলোচনায় তিনি গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার জন্য সরকারের অনুমোদিত নতুন খসড়া নিয়েও সমালোচনা করেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধানের একটি মৌলিক বিধান। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না; সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে কোনো সংসদ সদস্যের পদ বহাল আছে কি না, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর ভোট দেওয়ার যোগ্যতা আছে কি না—এসব প্রশ্ন সাংবিধানিক ও নির্বাচনী আইনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়টি আরও আলোচিত হয়েছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে। সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই সংসদ সদস্যকে ২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটি নৈতিক স্খলনের অভিযোগের কথা জানিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

এর পর থেকেই তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত আলোচনা শুরু হয়। জামায়াত তাঁর সংসদীয় পদ বাতিলের জন্য নির্বাচন কমিশন ও স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়েছে বলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

তবে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া এবং সংসদ সদস্য পদ তাৎক্ষণিকভাবে শূন্য হয়ে যাওয়া—দুটি বিষয়কে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে ওই দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে। এ ধরনের কোনো বিরোধ দেখা দিলে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুযায়ী বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের জন্য যেতে পারে।

এখানেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ৭০ অনুচ্ছেদের ভাষা মূলত সংসদে কোনো সদস্যের দলবিরোধী ভোটের সঙ্গে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হলেও সেটির সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামো সংসদে সাধারণ কোনো বিল বা প্রস্তাবের ওপর ভোট দেওয়ার সঙ্গে এক নয়। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো সংসদ সদস্যের ভোটের ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ কীভাবে প্রযোজ্য হবে, সেটি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত আইনি কাঠামোর ব্যাখ্যার ওপর।

শিশির মনিরের বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, গাজী নজরুল ইসলাম যেহেতু বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর ভোট দেওয়ার অধিকার রয়েছে। তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে মূলত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ভোটাধিকার বনাম দলীয় অবস্থানের প্রশ্নটি সামনে এসেছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ৭০ অনুচ্ছেদ দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। এর ফলে সংসদ সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ঝুঁকির মুখে পড়েন। সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়েও ৭০ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য হিসেবে সরকারের স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি উঠে এসেছে।

অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করেন, এই বিধান সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ভোটদানের সুযোগ সীমিত করে। সাম্প্রতিক সময়েও ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত বিতর্ক জোরালো হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো একটি সাংবিধানিক পদে নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা নতুন নয়।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টিও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। শিশির মনির এ ঘটনাকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রপতি পদে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী দেওয়া এবং সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।

তবে গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। তিনি বর্তমানে সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁকে জামায়াত ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। তাঁর সংসদীয় আসন শূন্য হয়েছে কি না, অথবা তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কি না—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সম্পর্কিত।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার নিয়ে এই বিতর্কের আরেকটি দিক হলো গোপন ভোট ও দলীয় নির্দেশনার সম্পর্ক। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সরাসরি জনগণের ভোটে না হওয়ায় সংসদ সদস্যদের ভোটের রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক বেশি। কোনো দল যদি নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন করে, তখন দলীয় অবস্থান ও ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সম্ভাব্য দ্বন্দ্বও আলোচনায় আসে। এ ক্ষেত্রে ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা রাজনৈতিক দল ও সংসদ সদস্য উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে একই আলোচনায় শিশির মনির গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়ার জন্য সরকারের অনুমোদিত নতুন খসড়ারও সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, প্রস্তাবিত কাঠামো আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় পিছিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বিশেষ করে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া এবং তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকারের হাতে রাখার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, কার্যকর তদন্ত ও তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান এবং তথ্য সংরক্ষণের কাঠামোতে যথেষ্ট স্বাধীনতা থাকা প্রয়োজন।

গুমের ঘটনা তদন্ত ও প্রতিকারের বিষয়টি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মানবাধিকার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। ২০২৪ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গুমের ঘটনা তদন্তে একটি কমিশন গঠন করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিষয়ে একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

সরকারের প্রস্তাবিত আইনের কার্যকারিতা নিয়ে শিশির মনিরের আপত্তি মূলত তদন্তের স্বাধীনতা ও তথ্যের স্বচ্ছতাকে কেন্দ্র করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের তদন্ত যদি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়, যার বিরুদ্ধে অতীতে অভিযোগ উঠেছে, তাহলে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, গাজী নজরুল ইসলামের ভোটাধিকার এবং ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা—এই তিনটি বিষয় তাই বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনায় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠেছে। একদিকে রয়েছে একজন সংসদ সদস্যের ভোট দেওয়ার যোগ্যতার প্রশ্ন, অন্যদিকে রয়েছে দলীয় আনুগত্য ও সাংবিধানিক বিধানের সীমা।

শেষ পর্যন্ত গাজী নজরুল ইসলাম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কি না, সেটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের বিষয় নয়; তাঁর সংসদ সদস্য পদ বহাল আছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও সংবিধানের বিধান কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তার ওপরই বিষয়টি নির্ভর করবে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, তাঁর সংসদীয় অবস্থান ও নির্বাচনসংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের দিকে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের নজর থাকবে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ সাংবিধানিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সেই পদে নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার নিয়ে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলীয় শৃঙ্খলা, সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক অবস্থান এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে বিষয়টির চূড়ান্ত ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সংবিধান, প্রচলিত আইন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন >> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত