প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সফরটি কেবল একটি প্রশাসনিক সফর ছিল না, বরং এটি ছিল দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার এক সুস্পষ্ট প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পট পরিবর্তনের পর, প্রধানমন্ত্রীর ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ রাজনীতি সচেতন মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই সফরটি একই সঙ্গে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায় এবং দেশের প্রভাববিস্তারকারী অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সফরের শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি ছিল বেশ নিবিড় এবং সুপরিকল্পিত। কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতাবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে উন্নয়নের বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রীর বাঁশখালীতে বন্যায় গৃহহারা পরিবারদের মাঝে ঘর উপহার দেওয়ার অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত মানবিক ও স্পর্শকাতর। তবে দিনশেষে ফটিকছড়িতে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে তাঁর এই মিলনমেলা এবং হাটহাজারী বড় মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করার বিষয়টি ছিল এই সফরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। এটি কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং হেফাজতের তৃণমূল ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে।

হেফাজতে ইসলামের ভেতরে থাকা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও বিভাজনের রেশ কাটতে না কাটতেই প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সংগঠনটির নেতাকর্মীদের নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। গত কয়েক বছরে নানা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া সংগঠনটি এখন মনে করছে, সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের लंबित দাবিগুলো বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে। হেফাজতের নায়েব আমির মুফতি লোকমান হাকিম জানিয়েছেন যে, সংগঠনটির ভেতরে কোনো বিভক্তি নেই এবং বর্তমান সরকারকে দেশ পরিচালনায় পূর্ণ সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি সরকারের প্রতি তাদের আস্থার জায়গাটিকে আরও মজবুত করেছে।
হেফাজতে ইসলাম বর্তমানে তাদের দীর্ঘমেয়াদী দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে একটি নিবিড় যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এজন্য তারা ইতোমধ্যে একটি কার্যকর টিম গঠনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে নয়টি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, তার মধ্যে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনাবলী, ২০২১ সালের ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে হওয়া মামলা ও সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের সুষ্ঠু বিচার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, সরকারপ্রধান এসব দাবির যৌক্তিকতা বিবেচনা করবেন এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠনে আলেম সমাজের প্রস্তাবনাগুলোকে মূল্যায়ন করবেন।
দেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে সরকার এবং আলেম সমাজের এই সৌজন্য সাক্ষাৎ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামবিদ্বেষী শক্তির অপতৎপরতা মোকাবিলা এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আলেম সমাজের সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যে বার্তা এখানে পাওয়া যাচ্ছে, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন ভারসাম্য আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মুফতি হাবিবুর রহমান কাসেমী মনে করেন, এই সাক্ষাৎ সরকার ও হেফাজতের মাঝে বিদ্যমান দূরত্ব কমিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে উন্নয়নমূলক কাজে বড় ধরনের গতি আনবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর শুধু হেফাজতের আমিরকে সম্মান জানানোই নয়, বরং বৃহৎ অর্থে দেশের ধর্মীয় সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীকে কাছে টেনে নেওয়ার একটি কৌশলী পদক্ষেপ। তিনি যখন হাটহাজারী মাদ্রাসায় যান, তখন সেখানে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে, যা প্রমাণ করে যে স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনটির প্রভাব এখনো অটুট। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরটি বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও নতুন প্রাণসঞ্চার করেছে, কারণ তারা মনে করছেন সরকার ও ধর্মীয় সংগঠনের এই সুসম্পর্ক মাঠপর্যায়ে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সংহত করবে।

তবে এই সম্পর্কের সমীকরণ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং হেফাজতের উত্থাপিত দাবিগুলো সরকার কতটা দ্রুত বাস্তবায়ন করবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সরকার একদিকে যেমন উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চায়, তেমনি অন্যদিকে সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সমন্বয় করতে চাচ্ছে। হেফাজতের পক্ষ থেকে যে দাবিগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা নিরসন করা সরকারের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করার যে মানসিকতা উভয় পক্ষ থেকে দেখানো হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এই চট্টগ্রাম সফর দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। হেফাজতের মতো একটি প্রভাবশালী অরাজনৈতিক সংগঠন যখন সরকারের প্রতি আস্থা ও সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেয়, তখন তা সরকারের জন্য বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে। এখন দেখার অপেক্ষায় আছে যে, সরকার ও হেফাজতের এই নতুন সুসম্পর্ক আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক সম্মানের এই পথচলা দেশ ও জাতির কল্যাণে বয়ে আনবে সুফল এবং নিরসন হবে দীর্ঘদিনের সব অমীমাংসিত রাজনৈতিক জটিলতা।