প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে এক জটিল ও উত্তেজনাকর অধ্যায় বিরাজ করছে। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে নিজেদের রাজধানীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে নানামুখী কূটনীতি ও তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে নয়াদিল্লি। চলতি মাসের মধ্যেই যাতে প্রধানমন্ত্রী সপরিবারে ভারত সফর করেন, সেই লক্ষ্যে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যানেলে বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন মোড় দিতে এবং শীর্ষ পর্যায়ের একটি সফল সফরের জন্য দৃশ্যত একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির নানা অভিনব কৌশল নিচ্ছে দিল্লি। বিশেষ করে ভারতের মাটিতে বসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করা এবং একই সঙ্গে দেশের বহুল আলোচিত শহীদ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন খুনিকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরে রাজি থাকার মতো প্রলোভনমূলক ও সান্ত্বনাদায়ক বার্তা পর্যন্ত ঢাকাকে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি দিল্লি সফর করেন, তবে তিনি কোনোভাবেই অসন্তুষ্ট হয়ে বা খালি হাতে দেশে ফিরবেন না। তবে দিল্লির এই অতি আগ্রহ ও কূটনৈতিক তৎপরতায় সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ সরকার শেষ পর্যন্ত তড়িঘড়ি করে কোনো অপ্রস্তুত সফরে যাবে কি না, তা নিয়ে এখনো গভীর সংশয় ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ঢাকা ও নয়াদিল্লির বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই চিত্র উঠে এসেছে।
কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, প্রধানমন্ত্রীকে নিজেদের মাটিতে সফরে নিতে ভারত সরকার অতিরিক্ত মাত্রায় আগ্রহ ও তাগিদ দেখাচ্ছে, যার পেছনে তাদের সুনির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ কাজ করছে। ভারত যে হঠাৎ করেই তার দীর্ঘদিনের চিরাচরিত বাংলাদেশ নীতি বা দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি বদলে ফেলেছে, এমনটি ভাবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। উল্টো দিকে ঢাকার সঙ্গে নয়াদিল্লি একধরনের জটিল ও দ্বিমুখী বা ‘ডুয়েল গেম’ খেলছে বলে মনে করেন অভিজ্ঞ বিশ্লেষকরা। একদিকে বন্ধুত্বের প্রলেপ মেখে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার মিষ্টি কথা বলা হচ্ছে, আর অন্যদিকে বিভিন্ন গোপন ও প্রকাশ্য উপায়ে বাংলাদেশকে চাপে রাখার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের এই ধারাবাহিক অবনতি ভূরাজনৈতিক সমীকরণে প্রকারান্তরে ভারতকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পিছিয়ে দিচ্ছে। আর ঠিক এই ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের তাড়নাতেই মোদি সরকার যেকোনো মূল্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে পেতে চাইছে, যাতে তারা আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে পারে। কিন্তু বিগত দীর্ঘ সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে ঝুলে থাকা অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো, বিশেষ করে যৌথ নদীর পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলোর সমাধানে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে কার্যকর বা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এমতাবস্থায় সুনির্দিষ্ট কোনো অর্জন ও সমাধান ছাড়া এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে আত্মঘাতী হতে পারে বলে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

গত বছরের আগস্টের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে চরম আস্থার সংকট ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো কাটেনি। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়জুড়ে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পরিবর্তে বাংলাদেশকে নানাভাবে অস্থিতিশীল করার নেপথ্য চক্রান্তে লিপ্ত ছিল ভারতের একটি বিশেষ মহল। পরবর্তীতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি নতুন ও ইতিবাচক যাত্রা শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের প্রায় ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থার অভাব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটেনি। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান ও সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পথ বাদ দিয়ে উল্টো নানামুখী চাপ প্রয়োগের পুরোনো কূটনীতি আঁকড়ে ধরেছে দিল্লি। সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের মতো অমানবিক ঘটনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করে তোলার মাধ্যমে বর্তমান সরকারকে প্রতিনিয়ত চাপে রাখার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন সময়ে সম্পর্ক উন্নয়নের ইতিবাচক মৌখিক বার্তা দিয়ে ঢাকাকে একধরনের কূটনৈতিক বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।
জাতীয় স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং কৌশলগত ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার জীবনের প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া হয়ে চীনকে বেছে নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সেই সুদূরপ্রসারী চীন সফরটিকেও স্বাভাবিক ও সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেনি নয়াদিল্লি। এর কিছুদিন পরেই গত ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীর পবিত্র দিনে বাংলাদেশের স্পষ্ট ও কঠোর আগাম সতর্কবার্তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নয়াদিল্লিতে বসে হাসিনাকে প্রথমবারের মতো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিংয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দেয় ভারত। এই নজিরবিহীন ও উসকানিমূলক পদক্ষেপে বাংলাদেশ সরকার চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে অত্যন্ত কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। গত ৫৫ বছরের কূটনৈতিক ইতিহাসে এর আগে কখনোই এত শক্ত ও কড়া ভাষায় ভারতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশ সরকারের সেই জোরালো প্রতিবাদলিপিতে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, জুলাই বিপ্লবের শহীদের রক্তের দাগ শুকানোর আগেই ঘাতক হাসিনাকে দিয়ে শহীদদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করানোর সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের পবিত্র সার্বভৌমত্বকে চরমভাবে অপমান করা হয়েছে। দিল্লির এই অবমাননাকর পদক্ষেপ দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।
বাংলাদেশের সেই কঠোর ও আপসহীন কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার পর নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং নীতিনির্ধারক মহলে একধরনের তোলপাড় শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাফাই গেয়ে বলেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন বা সমর্থনের পেছনে ভারত সরকারের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল না। কিন্তু দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, হাসিনাকে মিডিয়ার সামনে এনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি হিতে বিপরীত হয়েছে এবং তা খোদ ভারতীয় নীতিনির্ধারকদেরই বিপাকে ফেলেছে। বিশেষ করে ওই সংবাদ সম্মেলনে পলাতক হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেওয়া উসকানিমূলক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য নয়াদিল্লির কূটনৈতিক হিসাবনিকাশ সম্পূর্ণ উল্টে দেয়। জয় তার বক্তব্যে বাংলাদেশকে প্রকাশ্যে ‘দ্বিতীয় পাকিস্তান’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং সেখানে তথাকথিত জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে বলে দাবি করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি সামরিক বা রাজনৈতিকভাবে ভারতের হস্তক্ষেপ করার জোরালো আহ্বান জানান। এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের কারণে ভারতের আঞ্চলিক কূটনীতিতে চরম অস্বস্তি তৈরি হয় এবং বাধ্য হয়েই মোদি সরকার কিছুটা সুর নরম করতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে কাজ করা একজন জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কূটনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ভারতের নীতি-নির্ধারণী কাঠামো অত্যন্ত জটিল ও বহুমুখী। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন এবং পরিচালনায় মূলত তিনটি প্রধান শক্তির প্রভাব রয়েছে। প্রথমত, ঐতিহ্যবাহী পররাষ্ট্র দপ্তর বা সাউথ ব্লক; দ্বিতীয়ত, দেশটির শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং তৃতীয়ত, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এর মধ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে থাকে। গত ৫ আগস্টের হাসিনাকান্ডের নেপথ্যে ভারতীয় পররাষ্ট্র দপ্তরের কোনো ধরনের সমর্থন বা সম্মতি ছিল না। মূলত দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর একটি অতিউৎসাহী অংশ এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপির একটি উগ্রপন্থী অংশ যৌথভাবে হাসিনাকে মিডিয়ার সামনে নিয়ে আসার কুপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল। তারা মূলত দেখতে চেয়েছিল যে, ভারতে বসে হাসিনাকে রাজনৈতিক মাঠে কিছু বাড়তি সুবিধা ও প্ল্যাটফর্ম দিলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি কেমন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখায়। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত রয়েছেন ভারতের সাবেক দুই প্রভাবশালী হাইকমিশনার বীণা সিক্রি এবং রীভা গাঙ্গুলি দাসের মতো কট্টর বাংলাদেশবিরোধী সাবেক কূটনীতিকরা।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ভারতীয় গণমাধ্যমে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে পলাতক শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অবস্থানকে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে চলেছেন। তিনি ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে দাবি করেছেন যে, হাসিনা তার নিজের দেশে ফিরতে চান এবং তিনি তার রাজনৈতিক বক্তব্য যেকোনো উপায়ে প্রকাশ করতেই পারেন, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনোভাবেই বাধা হতে পারে না। শুধু তাই নয়, তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তীব্র ও অপ্রাসঙ্গিক ভাষায় আক্রমণ করে বলেন যে, গত ছয় মাসে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে নাকি বর্তমান সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অথচ নির্বাচনের প্রাক্কালে নাকি বর্তমান নেতৃত্ব দিল্লির কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তারা ক্ষমতায় এলে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে ভারতকেই বেছে নেবেন এবং আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবেন। তারেক রহমান নাকি সেই প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করে প্রথমে চীন সফর করেছেন এবং তিনি নাকি তার মা বেগম খালেদা জিয়ার মতো নমনীয় ও সহনশীল নন—এমন সব ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্যও করেছেন এই সাবেক কূটনীতিক। অন্যদিকে, অপর সাবেক হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাস জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসিনাকে ভারতের ‘পরীক্ষিত বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করে তার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, হাসিনা ভারতে বসে কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন না এবং তাকে ভারত সরকার কোনো সাধারণ রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অনুরোধে নিরাপত্তার খাতিরে বিশেষ মর্যাদায় দিল্লিতে অতিথি হিসেবে রেখেছে।
এদিকে দিল্লির নীতিনির্ধারক মহলের একটি বাস্তবসম্মত অংশ এখন বুঝতে পেরেছে যে, ঢাকা-দিল্লির পারস্পরিক সম্পর্ক মসৃণ ও স্বাভাবিক করে তোলার ক্ষেত্রে পলাতক হাসিনা এখন সবচেয়ে বড় অন্তরায় ও গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। বিশেষ করে গত ৫ আগস্টের বিতর্কিত হাসিনাকান্ডের পর এই সত্যটি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দূরদর্শী নীতিনির্ধারকরা উপলব্ধি করছেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ভারতের নিরাপত্তাগত ও কৌশলগত বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। ভারতের মূলধারার অনেক প্রভাবশালী গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীও এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, একজন ব্যর্থ রাজনৈতিক ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষার চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ও স্থিতিশীল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা দেশটির জাতীয় স্বার্থে অনেক বেশি জরুরি। দ্য হিন্দু পত্রিকার বিশিষ্ট কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার তার এক নিবন্ধে স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে, ২০২৪ পরবর্তী বাংলাদেশে সংঘটিত রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নয়াদিল্লির আঞ্চলিক নীতির জন্য একটি বিরাট কৌশলগত ধাক্কা। তাই ভারতকে অবশ্যই অতীতের সব কূটনৈতিক উত্তেজনা ও ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলে ঢাকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান বা ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ তার একান্ত নিজস্ব বিষয় হতে পারে, কিন্তু তাকে ভারতের ভূখণ্ড থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণার সুযোগ দেওয়া হলে তা দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগের পথকে চিরতরে জটিল করে তুলবে। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে ঢাকা-দিল্লির মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির স্বার্থের কাছে জিম্মি করে রাখা উচিত নয় বলেও তিনি জোরালো মত প্রকাশ করেছেন।
একইভাবে ভারতের স্বনামধন্য ইংরেজি দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সম্পাদকীয় পাতায়ও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, মানবিক কারণে হাসিনাকে সাময়িক আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তটি হয়তো সঠিক ছিল, কিন্তু সেই আশ্রয়স্থলকে পরবর্তীতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়াটা একটি মস্তবড় কৌশলগত ভুল হয়েছে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে সম্মানিত অতিথি হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে, কিন্তু দুই দেশের মধ্যকার সার্বভৌম ও বহুমুখী সম্পর্ক এত বেশি তাৎপর্যপূর্ণ যে তা কোনোভাবেই একজন ব্যক্তির সংকীর্ণ স্বার্থের বলি হতে পারে না। এই ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে গত ৯ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে এক দীর্ঘ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। এর ধারাবাহিকতায় পরদিন ১০ আগস্ট তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সেই সাক্ষাতে নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সপরিবারে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে দিল্লি সফরে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভারত সরকারের গভীর আগ্রহের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি যে অভিনন্দন বার্তা পাঠিয়েছিলেন, সেখানেই এই সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবেও তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানান মোদি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বার্তাটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হলে সবার আগে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিল্লিকেই নিতে হবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি হাসিনা এবং শহীদ ওসমান হাদির মূল খুনিদের অবিলম্বে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি জানানো হয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা শেষে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করার পর গত ১০ আগস্ট রাতেই জরুরি ভিত্তিতে দিল্লি ফিরে যান। দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারের মনোভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, ত্রিবেদী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র আমলাতান্ত্রিক কূটনীতি, প্রথাগত কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার গোপন তৎপরতা দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। সম্পর্ককে প্রকৃত অর্থে স্বাভাবিক করতে হলে সর্বাগ্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে ভারতীয় হাইকমিশনারের দিল্লি অবস্থানের ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ করে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে আমন্ত্রণ থাকলেও আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সশরীরে যোগ দিচ্ছেন না—বাংলাদেশের এই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে দিল্লিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লি সফরের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, ভারতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর নিয়ে এখনো পর্যন্ত চূড়ান্ত বা সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। দুই দেশের কূটনৈতিক সুবিধাজনক এবং পারস্পরিক অনুকূল সময়ে আলোচনার মাধ্যমেই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে যে, হঠাৎ করে কেন নরেন্দ্র মোদি সরকার চলতি মাসের স্বল্প সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে যেকোনো মূল্যে দিল্লি সফরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে? এই আকস্মিক ও অতি আগ্রহ সাধারণ মানুষের মনে নানা যৌক্তিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তাছাড়া এত অল্প সময়ের মধ্যে দিল্লির মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা কি আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়েও বিশ্লেষকরা সন্দিহান।
বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শহীদুজ্জামান অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মনে করেন যে, তড়িঘড়ি করে এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নিয়ে যাওয়ার যে তোরজোড় দিল্লি দেখাচ্ছে, তার পেছনে সম্পূর্ণভাবে তাদের নিজস্ব সংকীর্ণ ভূরাজনৈতিক স্বার্থ লুকিয়ে রয়েছে। এখানে বাংলাদেশের কোনো জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। প্রধানমন্ত্রী দিল্লি গেলে নিমিষেই দুই দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন ধরনের মিষ্টি প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকাকে মূলত প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। তিনি অত্যন্ত সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমুখী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব অত্যন্ত সফলভাবে এগিয়ে চলেছে, যা এই মুহূর্তে সুসংহত করার সময়। এই স্পর্শকাতর মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর হুট করে দিল্লি সফর করা হলে তা আমাদের আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ভারত যদি এই মুহূর্তে তারেক রহমানকে তাদের রাজধানীতে আমন্ত্রণ জানাতে সফল হয়, তবে নিশ্চিতভাবেই তারা তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে তাদের পুরনো আপত্তির কথা জোরালোভাবে উত্থাপন করবে। আর বাংলাদেশ যদি তাদের সেই অন্যায্য আপত্তি ও আধিপত্যবাদী দাবি না মেনে নেয়, তবে পরবর্তীতে নানা ধরনের ব্ল্যাকমেল করা এবং অর্থনৈতিক বা ট্রানজিট সংক্রান্ত চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

অধ্যাপক শহীদুজ্জামান আরও জোরালোভাবে বলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের জন্য এটি কোনোভাবেই উপযুক্ত সময় বা অনুকূল পরিবেশ নয়। ভারতের দিক থেকে আগে নিজেদের অবস্থান সম্পূর্ণ পরিষ্কার করতে হবে। বাংলাদেশ তার নিজস্ব রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান কিংবা তুরস্ক—যাদের সঙ্গেই কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলুক না কেন, তাতে দিল্লির কোনো ধরনের আপত্তি বা মাথাব্যথা থাকবে না—এই ঘোষণা নয়াদিল্লিকে প্রকাশ্যে দিতে হবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত মৌলিক ও জীবনমরণ ইস্যুগুলো, যেমন তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বন্টন, সীমান্তে বর্বরোচিত ফেলানী হত্যার মতো বিচারবহির্ভূত হত্যা চিরতরে বন্ধ করা এবং অন্যান্য সীমান্তবর্তী সমস্যা সমাধানের বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো শীর্ষ নেতার পক্ষে দিল্লি সফর করা কিছুতেই সমীচীন হবে না বলে এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে সফরে নিয়ে যাওয়ার দিল্লির সাম্প্রতিক অতি তৎপরতা সম্পর্কে দেশের নীতিনির্ধারক মহলকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে সবসময় এই বাস্তবায়ন মাথায় রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বাস্তবতাকে ভারত মনস্তাত্ত্বিকভাবে এখনো পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি। তারা এখন পর্যন্ত এমন একটিও বিশ্বাসযোগ্য বা গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি, যার মাধ্যমে ভারতকে সত্যিকারের আস্থায় নেওয়া সম্ভব হয়। ভারতীয় দূত এবং কূটনীতিকরা ঢাকায় এসে নানা রকম মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছেন, কূটনৈতিক শিষ্টাচার দেখাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তাদের কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ বা সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, যেদিন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে বন্ধুত্বের নানা প্রবোধ দিচ্ছেন, ঠিক তার আগের দিনও বাংলাদেশের সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। একদিকে তারা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর কথা বলছে, আর অন্যরাই আবার নিজেদের ভূখণ্ডে সাবেক স্বৈরাচারী শাসককে বসিয়ে রেখে আমাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ‘হাসিনা কার্ড’ খেলছে। এভাবে প্রতারণামূলক ও বৈরী মনোভাব নিয়ে কখনো দুই সার্বভৌম দেশের প্রকৃত সম্পর্ক হতে পারে না।
ড. দিলারা চৌধুরী দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করেন যে, শুধু শহীদ হাদির খুনিদের নামমাত্র হস্তান্তর কিংবা পলাতক হাসিনার কিছুটা রাজনৈতিক তৎপরতা সাময়িকভাবে সীমিত করার ফাঁদে পা দিলে চলবে না। এর বাইরেও পানি বণ্টন চুক্তি, স্থায়ীভাবে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একতরফা পানি প্রত্যাহারসহ সব অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ভারতকে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু তাই নয়, বিগত দিনে যারা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে ব্যর্থ হয়ে কিংবা অপরাধ সংঘটিত করে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন, সেই সমস্ত পলাতক বাংলাদেশি অপরাধী ও বিতর্কিত সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাদের অবিলম্বে বাংলাদেশের আদালতের মুখোমুখি করার জন্য ফেরত পাঠাতে হবে। তিনি মনে করেন যে, ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধানের জন্য বর্তমান সময়টিই সবচেয়ে উপযুক্ত সুযোগ। কিন্তু অন্ধভাবে শুধু দিল্লির ফাঁকা আশ্বাসের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে প্রধানমন্ত্রী যদি কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি বা প্রাপ্তি ছাড়া ভারত সফরে যান, তবে তা দেশের জাতীয় রাজনীতির জন্য মারাত্মক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হিসেবে পরিগণিত হবে। বর্তমানের এই চরম ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও উত্তেজনার যুগে তাড়াহুড়ো করে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সফর করা থেকে বিরত থাকার জন্য সরকারের প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছেন এই প্রবীণ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।