প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সীমান্ত নদী রায়মঙ্গল। তার স্রোতের সঙ্গে যেন ভেসে থাকে একটি অদৃশ্য শূন্যরেখা। একদিকে বাংলাদেশের সুন্দরবন, অন্যদিকে ভারত। মাঝখানে বিস্তীর্ণ জলরাশি। কোথায় বাংলাদেশ শেষ, কোথা থেকে ভারতের শুরু—খালি চোখে তা বোঝার উপায় নেই।
স্থলসীমান্তের মতো এখানে নেই কাঁটাতার, নেই সারি সারি সীমান্ত পিলার। জোয়ারে যে জায়গা নদী, ভাটায় সেখানে কাদা। প্রকৃতি প্রতিদিন নিজের মানচিত্র বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রের সীমারেখা বদলায় না। ফলে রায়মঙ্গলের সীমান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শেষ প্রান্তকে চিহ্নিত করে মূলত একটি অদৃশ্য রেখাই।
রায়মঙ্গল অবশ্য কেবল একটি সীমান্ত নদীর নাম নয়। সীমান্ত হওয়ার বহু আগে থেকেই এটি সাহিত্য, লোকবিশ্বাস এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক নদী।
মধ্যযুগীয় বাংলা আখ্যানকাব্য ‘রায়মঙ্গল’-এ বাঘের অধিপতি দক্ষিণ রায়, অরণ্যের প্রতাপ এবং অনিশ্চিত শক্তির লোকায়ত রূপ উঠে এসেছে। সেই আখ্যানের পেছনে রয়েছে এমন এক জনপদের স্মৃতি, যেখানে মানুষের জীবন প্রকৃতির অনুকম্পার ওপর নির্ভরশীল ছিল। সুন্দরবনের মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলেদের জীবনেও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যায়। বন ছিল তাঁদের জীবিকার উৎস, আবার একই সঙ্গে ছিল ভয় ও বিপদের জায়গা।
এই অনিশ্চয়তা থেকেই সুন্দরবনের লোকঐতিহ্যে বনবিবির আখ্যানের জন্ম। শাহ জঙ্গলি, দক্ষিণ রায়, ধোনা ও দুখেকে ঘিরে গড়ে ওঠা সেই কাহিনিতে বনবিবি হয়ে উঠেছেন আশ্রয়ের প্রতীক। বনে প্রবেশের আগে তাঁর কাছে নিরাপদে ফিরে আসার প্রার্থনা কেবল ধর্মীয় আচারের বিষয় নয়; প্রতিকূল প্রকৃতির সামনে মানুষের সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতিও।
সুন্দরবনের এই প্রাচীন জীবনদর্শনের মূল কথাটি যেন স্পষ্ট—মানুষ এই বনকে জয় করেনি, বরং বনের সঙ্গে বোঝাপড়া করে টিকে থেকেছে।
সময় বদলেছে। রায়মঙ্গলের বুক দিয়ে একসময় স্টিমার চলেছে। ব্রিটিশ আমলে এই নদীপথে কলকাতা থেকে বরিশাল হয়ে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন বন্দরে যাতায়াত হতো। ১৯৪৬ সালে কবি জীবনানন্দ দাশও শেষবারের মতো বরিশাল থেকে কলকাতা গিয়েছিলেন রায়মঙ্গল নদীপথে।
যে জলপথ একসময় দুই বাংলার মানুষকে যুক্ত করত, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তার একটি অংশই হয়ে গেল আন্তর্জাতিক সীমান্ত।
কিন্তু নদী র্যাডক্লিফের রেখা বোঝে না। জোয়ার দুই পাড়েই আসে, বাঘ সীমান্ত চেনে না, পাখি উড়ে যায় পাসপোর্ট ছাড়াই। রাষ্ট্রীয় সীমানার ধারণাটি কেবল মানুষের তৈরি। মাঝনদীর কোথাও একটি অদৃশ্য রেখা টেনে মানুষ নির্ধারণ করেছে কোন অংশ বাংলাদেশ আর কোন অংশ ভারত।
স্থলসীমান্তে সেই রেখা পিলার, কাঁটাতার ও সড়কের মাধ্যমে দৃশ্যমান করা যায়। রায়মঙ্গলে সামনে শুধু পানি, আর তার ওপারে গহিন অরণ্য। তাই এই জল-জঙ্গলের সীমান্ত পাহারার ধরনও আলাদা।
রায়মঙ্গল ও বয়েসিং খালের মোহনায় ভাসছে বয়েসিং ভাসমান বিওপি। ২০২৫ সালের ১৭ মে এর যাত্রা শুরু হয়। সুন্দরবনে এটি বিজিবির তৃতীয় ভাসমান বিওপি।
বাংলাদেশের প্রায় ১৮০ কিলোমিটার নদীসীমান্তের মধ্যে ৭৯ কিলোমিটারই সুন্দরবন এলাকায়। দুর্গম এই জলসীমান্তে বয়েসিং একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অপারেশনাল প্ল্যাটফর্ম। এখান থেকে জলপথে টহল ও নজরদারি চালানো হয়। চোরাচালান, মানব পাচার, অবৈধ অনুপ্রবেশ, ডাকাতি এবং বনজ সম্পদ লুট প্রতিরোধও এর দায়িত্বের অংশ।
তবে কাগজে-কলমে একটি ভাসমান বিওপির পরিচয় যতটা সহজ, বাস্তবে তার জীবনযাপন ততটা নয়।
লোকালয় থেকে দূরে, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গহিন অরণ্যের মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন কয়েকজন সীমান্তরক্ষী। একই ডেক, একই নৌযান, একই জলপথ এবং প্রতিদিনের অনিশ্চিত পরিবেশ তাঁদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
বয়েসিংয়ের ডেকে দাঁড়িয়ে এই বিচ্ছিন্ন জীবনের একটি মানবিক দিক সামনে আসে সৈনিক আকাশের গল্পে।
আকাশের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। জীবনের এমন সময়ে যখন একজন স্বামীর সবচেয়ে বেশি করে পরিবারের পাশে থাকার কথা, তখন তিনি বহু দূরে রায়মঙ্গলের মোহনায় দায়িত্ব পালন করছেন। ফোনের ওপাশে তাঁর পরিবার অপেক্ষা করছে, আর এ পাশে তাঁর দায়িত্ব সীমান্ত পাহারা দেওয়া।
আকাশ একা নন। বয়েসিংয়ে দায়িত্ব পালন করা কারও সন্তান অপেক্ষা করছে, কারও বৃদ্ধ মা-বাবা, কারও স্ত্রী। দীর্ঘদিন একই পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে করতে সহযোদ্ধাদের মধ্যেও তৈরি হয় এক ধরনের পারিবারিক বন্ধন।
পেশাদারিত্ব, পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে ওঠে সেই সম্পর্ক। বিপদের মুহূর্তে একজনের জীবন অন্যজনের ওপর নির্ভর করে।
সুন্দরবনের পুরোনো মৌয়াল ও বাওয়ালিরাও বিপদসংকুল অরণ্যে একা প্রবেশ করতেন না। সময় বদলেছে, উদ্দেশ্য বদলেছে। আজ সীমান্তরক্ষীরা জীবিকা সংগ্রহের জন্য নয়, রাষ্ট্রের সীমান্ত ও মানুষের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে সেখানে অবস্থান করেন।
তবে সুন্দরবনের একটি প্রাচীন সত্য এখনও অটুট—এই অরণ্যে মানুষ একা টিকে থাকে না।
আজকের সীমান্তরক্ষীর নিরাপত্তা লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে না। প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি এবং সুসংগঠিত কমান্ড কাঠামোই তাঁদের নিরাপত্তার ভিত্তি। কিন্তু সহযোদ্ধার ওপর নির্ভরতা এবং প্রতিকূল পরিবেশে দলবদ্ধভাবে টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তা এখনও একই রয়ে গেছে।
রায়মঙ্গলের এই ভূগোলে দক্ষিণ রায়ের পুরোনো প্রতীকও যেন নতুন অর্থ পায়।
লোককথায় দক্ষিণ রায় ছিলেন অরণ্যের প্রতাপ ও কর্তৃত্বের প্রতিরূপ। আর আজ সেই অরণ্যের বুকেই বয়েসিংয়ের সৈনিকদের কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের দেওয়া। তাঁদের দায়িত্ব বাংলাদেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়া।
তাঁদের উপস্থিতি যেন একটি সরল বার্তা দেয়—বাংলাদেশের শেষ প্রান্তটুকুও অরক্ষিত নয়।
একসময় এই অরণ্যে ছিল দক্ষিণ রায়ের প্রতাপ, বনবিবির আশ্রয় এবং মৌয়াল-বাওয়ালিদের জীবনসংগ্রাম। এরপর এসেছে ঔপনিবেশিক স্টিমার, দেশভাগ এবং র্যাডক্লিফের সীমারেখা। এখন সেই একই স্রোতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ভাসমান বিওপি।
রায়মঙ্গলের জল প্রতিদিন বদলায়। জোয়ার আসে, ভাটা যায়। স্রোত কখনও তীব্র হয়, কখনও শান্ত। নদীর চরিত্র বদলায়, বদলায় সময়ও। কিন্তু সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব বদলায় না।
গহিন সুন্দরবনের বুকের সেই ভাসমান বিওপি তাই শুধু একটি নিরাপত্তা স্থাপনা নয়। এটি রাষ্ট্রের অদৃশ্য সীমারেখাকে দৃশ্যমান করে তোলা এক প্রতীক—স্রোতের মধ্যে ভেসে থাকা এক টুকরো বাংলাদেশ।