আছিয়া হত্যা মামলার হাইকোর্টের রায় পিছিয়ে ৩১ আগস্ট

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মাগুরার আলোচিত আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় পিছিয়েছে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রায় ঘোষণার কথা থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী সোমবার, ৩১ আগস্ট নতুন দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ মঙ্গলবার নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ইমাম হোসেন তারেক। আসামিপক্ষে দায়িত্ব পালন করছেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান।

আদালতের কার্যক্রমের শুরুতে রাষ্ট্রপক্ষ সময় চায়। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানি করেছেন এবং তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। সেই কারণে রায় ঘোষণার জন্য সময় প্রার্থনা করা হয়। আদালত আবেদন মঞ্জুর করে ৩১ আগস্ট দিন নির্ধারণ করেন।

এর আগে সোমবার মামলাটি রায়ের জন্য মঙ্গলবারের কার্যতালিকায় রাখা হয়েছিল। ফলে সকাল থেকেই আলোচিত এই মামলার রায় নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত রায় ঘোষণা না হওয়ায় নিহত শিশুর পরিবারসহ বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে নজর রাখা মানুষের অপেক্ষা আরও কয়েক দিন বাড়ল।

আছিয়ার ঘটনা ২০২৫ সালের মার্চে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও শোক তৈরি করেছিল। মাগুরা সদর উপজেলার নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে শিশুটি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তাকে ফরিদপুর ও ঢাকায় নেওয়া হয় এবং শেষ পর্যায়ে ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৩ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার পর শিশুটির মা মামলা করেন। প্রধান আসামি হিসেবে বোনের শ্বশুর হিটু শেখের নাম আসে। মামলায় সজীব শেখ, তার ভাই রাতুল শেখ এবং তাদের মা জাহেদা বেগমকেও আসামি করা হয়েছিল।

পুলিশ দ্রুত তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দেয়। পরে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়। মামলাটির বিচারিক কার্যক্রমও তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়েছিল।

২০২৫ সালের ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসান প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই রায়ে মামলার অন্য তিন আসামি সজীব শেখ, রাতুল শেখ ও জাহেদা বেগমকে খালাস দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার নিয়ম অনুযায়ী সেটি সরাসরি কার্যকর হওয়ার সুযোগ থাকে না। বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়াই ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত।

আছিয়া হত্যা মামলার ক্ষেত্রেও বিচারিক আদালতের নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। পাশাপাশি হিটু শেখের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। ফলে ডেথ রেফারেন্স এবং আপিল একইসঙ্গে হাইকোর্টে শুনানির জন্য আসে।

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের একাধিক আলোচিত ঘটনার পর ডেথ রেফারেন্স ও আপিলগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জোরালো হয়। সেই প্রেক্ষাপটে চলতি বছরের ১০ জুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মৃত্যুদণ্ডসংক্রান্ত মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য একটি বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করেন।

আছিয়া হত্যা মামলাও সেই বিশেষ বেঞ্চের কার্যতালিকায় আসে। গত ১১ আগস্ট বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে প্রথম দিন শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ইমাম হোসেন তারেক।

এরও আগে ১৪ জুন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আছিয়া হত্যা মামলা এবং আরেক আলোচিত শিশু হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন।

রাষ্ট্রপক্ষের জন্য বিশেষ আইনজীবী দলও গঠন করা হয়। মামলার গুরুত্ব, জনমনে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়া এবং নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

আছিয়ার মৃত্যুর পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ হয়েছিল। শিশু ও নারীর নিরাপত্তা, যৌন সহিংসতার বিচার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি আবারও সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়।

তবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় আবেগের পাশাপাশি সাক্ষ্য, মেডিকেল রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত, জবানবন্দি এবং আইনি যুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। বিচারিক আদালতের রায় হাইকোর্টে পরীক্ষা করার সময় এসব উপাদান পুনরায় মূল্যায়ন করা হয়।

ডেথ রেফারেন্সের শুনানিতে হাইকোর্ট সাধারণত বিচারিক আদালতের রায়, সাক্ষ্য ও প্রমাণ যাচাই করে দেখে মৃত্যুদণ্ড আইনসঙ্গতভাবে দেওয়া হয়েছে কি না। আসামির আপিল থাকলে তার উত্থাপিত আইনি ও তথ্যগত যুক্তিও বিবেচনা করা হয়।

ফলে বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ড হাইকোর্ট বহাল রাখতে পারে। আবার আইন ও প্রমাণের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সাজা পরিবর্তন কিংবা খালাস দেওয়ার ক্ষমতাও উচ্চ আদালতের রয়েছে।

এই কারণেই ৩১ আগস্টের রায় মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের পরও আইন অনুযায়ী আপিল বিভাগের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।

আছিয়ার মামলার বিচারিক আদালতের রায় দ্রুত এসেছিল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হওয়ায় সেই সময় মামলাটি দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার আলোচিত উদাহরণ হয়ে ওঠে।

তবে দ্রুততার পাশাপাশি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো সর্বোচ্চ সাজার ক্ষেত্রে প্রতিটি সাক্ষ্য ও আলামতের গভীর পর্যালোচনা বিচারব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্ব।

হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত একাধিক ডেথ রেফারেন্স ও আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনেছে। বাসসের তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ বেঞ্চ গঠনের পর প্রথম এক মাসেই এ ধরনের ১০টি মামলায় রায় দেওয়া হয়েছিল।

সোমবারই একই বেঞ্চ আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলে রায় দিয়েছেন। সেখানে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে দুজনের সাজা বহাল রাখা হয়, চারজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেওয়া হয় এবং অন্যদের খালাস দেওয়া হয়।

এই প্রেক্ষাপটে আছিয়া হত্যা মামলার রায়ও আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের বিশেষ নজরে রয়েছে।

শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার দাবি করা হলেও একটি মামলার শেষ পরিণতি শুধু দ্রুত রায়ের ওপর নির্ভর করে না। সঠিক তদন্ত, নির্ভরযোগ্য ফরেনসিক পরীক্ষা, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং সব পক্ষের আইনি অধিকার নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

আছিয়ার ঘটনায় সেই বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ড হাইকোর্টের পরীক্ষায় টিকে থাকে কি না, সেটিই দেখার বিষয়।

মঙ্গলবার রায়ের অপেক্ষায় থাকা পরিবার ও জনসাধারণকে আপাতত আরও ছয় দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আগামী ৩১ আগস্ট হাইকোর্টের নির্ধারিত বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণার কথা রয়েছে।

এই রায় শুধু একজন আসামির সাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। বহুল আলোচিত শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় উচ্চ আদালতের আইনি মূল্যায়ন কী হয়, সেটিও স্পষ্ট করবে।

আট বছরের একটি শিশুর নির্মম মৃত্যুর পর পরিবার যে বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন তাই এখন ৩১ আগস্ট। সেদিন হাইকোর্ট কী সিদ্ধান্ত দেন, সেদিকেই থাকবে সবার নজর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত