র‍্যাব কর্মকর্তা সেজে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, যুবক গ্রেপ্তার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার
র‍্যাব কর্মকর্তা সেজে কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, যুবক গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নিজেকে কখনো র‍্যাব কর্মকর্তা, আবার কখনো সেনাবাহিনীর মেজর বা কর্নেল পরিচয় দিয়ে এক স্কুলছাত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে ২২ বছর বয়সী এক যুবকের বিরুদ্ধে। পরে ভুয়া বিয়ের নাটক সাজিয়ে ওই কিশোরীকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে গিয়ে দীর্ঘদিন যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ করা হয়েছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে পারভেজ বেপারী নামের ওই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, পিরোজপুরের কাউখালী থানা ও বাগেরহাটের মোংলা থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে সোমবার বিকেলে মোংলা পৌর শহর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আইনি প্রক্রিয়া শেষে কাউখালী থানার পুলিশ তাকে পিরোজপুরে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তার পারভেজ খুলনা সদর এলাকার ২৩ নম্বর রোডের সাখাওয়াত বেপারীর ছেলে।

পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, প্রযুক্তির সহায়তায় নিজেকে দেশের একটি বিশেষ বাহিনী র‍্যাব এবং সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করতেন পারভেজ। এ পরিচয় ব্যবহার করেই পিরোজপুরের এক স্কুলছাত্রীর সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ। একপর্যায়ে তিনি ওই কিশোরীকে বিয়ের আশ্বাস দেন এবং ভুয়া বিয়ের আয়োজনের মাধ্যমে তাকে বিশ্বাস করান যে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সম্পর্কের মধ্যে রয়েছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কিশোরীকে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ করেন পারভেজ। শুধু পিরোজপুর বা খুলনায় নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানেও তারা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে অবস্থান করেছেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি পরবর্তীতে পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রকাশ পেলে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

একজন কিশোরীর সঙ্গে পরিচয়, বিশ্বাস অর্জন এবং সেই বিশ্বাসকে ব্যবহার করে তাকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতারণা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের মাধ্যমে ভুয়া পরিচয় তৈরি করে মানুষের আস্থা অর্জনের প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পারভেজের বিরুদ্ধে একই ধরনের কৌশলে আরও কয়েকজন নারীর সঙ্গে প্রতারণার তথ্যও প্রাথমিকভাবে পাওয়া গেছে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় পারভেজের পরিচয় ও কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ার পর। ভুক্তভোগী কিশোরীর মা নিলুফা বেগম এ ঘটনায় কাউখালী থানায় মামলা করেন। মামলার পর গ্রেপ্তার এড়াতে পারভেজ খুলনা থেকে মোংলায় গিয়ে আত্মগোপন করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এরপর তাকে ধরতে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হয়।

পুলিশের অনুসন্ধানে পারভেজের মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে কাউখালী থানা পুলিশ মোংলা থানা পুলিশকে বিষয়টি জানায়। পরে দুই থানার সদস্যরা যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করেন। সোমবার দুপুরে মোংলা পৌর শহরের বনফুল মিষ্টির দোকানের সামনে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মানিক চন্দ্র গাইন জানান, কাউখালী থানার পুলিশ পারভেজের মোংলায় অবস্থানের তথ্য নিশ্চিত করার পর তাদের অবহিত করে। পরে দুই থানার পুলিশের সমন্বিত অভিযানে তাকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তারের পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে কাউখালী থানার পুলিশ তাকে পিরোজপুরে নিয়ে যায়।

অভিযানে কাউখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মহিউদ্দিন ও সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) খায়রুল হাসান নেতৃত্ব দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাদের সঙ্গে মোংলা থানা পুলিশের সদস্যরাও অভিযানে অংশ নেন।

মামলার পর পারভেজ আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার করে তার অবস্থান শনাক্ত করার পর দ্রুত অভিযান পরিচালনা সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এতে অপরাধ তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেটিও সামনে এসেছে।

কাউখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে পারভেজের বিরুদ্ধে একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে একাধিক নারীর সঙ্গে প্রতারণার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করতে আরও তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে কথিত প্রতারণার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

এ ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভুক্তভোগী কিশোরীর নিরাপত্তা, মানসিক সহায়তা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। যৌন নিপীড়ন বা ধর্ষণের অভিযোগে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের ওপর সামাজিক, মানসিক এবং পারিবারিক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে তদন্তের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা এবং তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয় তৈরি করে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ঝুঁকিও এই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মেসেজিং অ্যাপ কিংবা অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই না করে দ্রুত ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে প্রতারণার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি আরও বেশি। পরিবারের সদস্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সচেতনতা তাই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে অভিযোগের প্রতিটি বিষয় তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা আইনগতভাবে সমীচীন নয়। পুলিশ ইতোমধ্যে মামলা, প্রযুক্তিগত তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে। তদন্তে আরও কী তথ্য বেরিয়ে আসে এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

পুলিশ জানিয়েছে, পারভেজের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। একই কৌশলে আরও কোনো নারী প্রতারণার শিকার হয়েছেন কি না এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা চলছে।

ঘটনাটি শুধু একটি মামলায় একজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মধ্য দিয়ে অনলাইন ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণার একটি উদ্বেগজনক দিকও সামনে এসেছে। ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে আস্থা অর্জন করে কোনো কিশোরী বা নারীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি এবং সেই সম্পর্ককে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ফলে তদন্ত দ্রুত, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্টদের প্রধান দায়িত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত