প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আজ আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের দিবসটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশে সাক্ষরতার হার বেড়ে ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে সংখ্যাগত অগ্রগতির পাশাপাশি মানসম্মত ও প্রয়োগিক শিক্ষার সুযোগ সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’—এবারের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। প্রতিপাদ্যের মধ্য দিয়ে সাক্ষরতাকে শুধু অক্ষরজ্ঞান, পড়া বা লেখার মৌলিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন, পরিবেশ সচেতনতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সাক্ষরতা একজন মানুষের ব্যক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি। নিজের নাম লিখতে বা একটি লেখা পড়তে পারার সক্ষমতার বাইরে আধুনিক সময়ে সাক্ষরতার ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। তথ্য বোঝা, প্রযুক্তি ব্যবহার, দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় হিসাব করা, স্বাস্থ্য ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা অর্জনের সক্ষমতাও এখন শিক্ষার বৃহত্তর পরিসরের অংশ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও গত কয়েক দশকে সাক্ষরতা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী মৌলিক শিক্ষার আওতায় এসেছে। এই অগ্রগতি প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তার, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক উদ্যোগের সম্মিলিত ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সাক্ষরতার হার বাড়লেও এখনো দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ থেকে বাইরে রয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু, বিভিন্ন কারণে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কিশোর-কিশোরী, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষাবঞ্চিত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষকে শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ।
শুধু বর্ণমালা চেনানো বা পড়তে-লিখতে শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে বর্তমান সময়ের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব নয়। একজন মানুষকে নিজের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা, কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করে তুলতে প্রয়োজন প্রয়োগিক সাক্ষরতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও ডিজিটাল দক্ষতা। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল সেবা ব্যবহারে সক্ষমতাও মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে উঠেছে।
এ কারণে সরকার এখন সাক্ষরতা কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, বয়স্ক শিক্ষা, জীবনদক্ষতা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত মানুষকে উন্নয়নের মূলধারায় যুক্ত করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য শুধু নিরক্ষরতা কমানো নয়, বরং শিক্ষাকে মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা।
বাংলাদেশের সংবিধানেও শিক্ষার বিষয়টি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃত। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং নিরক্ষরতা দূর করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের শিক্ষা উন্নয়নের বিভিন্ন কর্মসূচির পেছনে এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস সেই অঙ্গীকারকে নতুন করে সামনে আনার একটি সুযোগ। কারণ শিক্ষা শুধু ব্যক্তির ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করে না, এটি একটি পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা, সামাজিক মর্যাদা এবং পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। একজন শিক্ষিত মা-বাবা সাধারণত সন্তানের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে বেশি সচেতন হন। একইভাবে কর্মক্ষম বয়সের একজন মানুষ প্রয়োজনীয় পড়াশোনা ও দক্ষতা অর্জন করতে পারলে তার কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
সাক্ষরতার সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের সম্পর্কও গভীর। একজন নারী পড়তে ও লিখতে পারলে নিজের অধিকার, স্বাস্থ্য, সন্তানদের শিক্ষা এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়ে। ফলে নারী শিক্ষার প্রসার শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, একটি পরিবারের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অবশ্য এই সুযোগ নিশ্চিত করা তুলনামূলক কঠিন। দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, পারিবারিক অসচ্ছলতা, বিদ্যালয় থেকে দূরত্ব, সামাজিক বাধা এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক শিশু ও কিশোর-কিশোরী নিয়মিত শিক্ষার বাইরে চলে যায়। আবার অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ জীবিকার প্রয়োজনেই শিক্ষার সুযোগ নিতে পারেন না। তাদের জন্য নমনীয় সময়সূচি ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় ও মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাজধানীতে আলোচনা সভা ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্মাননা দেওয়ার আয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও আলোচনা সভা, র্যালি এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংগঠনও দিবসটি উপলক্ষে নিজস্ব কর্মসূচি পালন করছে।
১৯৬৭ সালে ইউনেসকো ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে প্রতি বছর দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে। এর মূল লক্ষ্য হলো সাক্ষরতার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং এখনো শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার ও প্রয়োজনকে সামনে নিয়ে আসা।
বাংলাদেশের জন্য ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ সাক্ষরতার হার নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তবে এই সংখ্যাকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একটি দেশের প্রকৃত শিক্ষাগত অগ্রগতি শুধু কতজন মানুষ পড়তে বা লিখতে পারেন, সেই পরিসংখ্যান দিয়ে পুরোপুরি বোঝা যায় না। মানুষ কতটা বুঝতে পারছে, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছে, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে এবং শিক্ষাকে জীবনের উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী দিনের বাংলাদেশের জন্য তাই সাক্ষরতা কার্যক্রমকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার প্রয়োজন রয়েছে। বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের ফিরিয়ে আনা, ঝরে পড়া রোধ, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রযুক্তি ও জীবনদক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং বাস্তবমুখী পাঠদানের ওপরও গুরুত্ব বাড়াতে হবে।
সাক্ষরতার বিস্তার একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগ। এর সুফল শুধু একজন শিক্ষার্থী বা একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। তাই আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসে বাংলাদেশের ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ সাক্ষরতার হার যেমন আশাবাদ তৈরি করছে, তেমনি বাকি জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আওতায় আনার দায়িত্বও নতুন করে সামনে আনছে। মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং টেকসই সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে এই অসম্পূর্ণ কাজটিই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারগুলোর একটি।