প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬ নিয়ে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিলটিকে কোরআন-সুন্নাহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আইনটি পর্যালোচনার দাবি তুলেছে হেফাজতে ইসলাম। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও বিলটির কয়েকটি বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে।
সোমবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে সমাবেশ করে জামায়াতে ইসলামী। পরে দলটির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। সমাবেশে বক্তারা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী বাতিল বা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান। তাদের বক্তব্য, মুসলমানদের সম্পত্তি হস্তান্তর, দান ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিধান শরিয়াহর নির্ধারিত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।
সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিলটি জাতীয় সংসদে পাস হয় ৬ সেপ্টেম্বর। সংশোধিত আইনে দাতা কোনো সম্পত্তি অন্যের নামে হস্তান্তর বা দান করলেও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। মূলত সম্পত্তি দানের পর দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তা ও ভোগদখলের অধিকার নিশ্চিত করাই সংশোধনের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে সামনে এসেছে।
জামায়াতের নেতারা অবশ্য বলছেন, ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান, পারিবারিক বাস্তবতা এবং বিদ্যমান আইনব্যবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সমাবেশে অভিযোগ করেন, বিএনপি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন না করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় এসে তা মানছে না। তাঁর দাবি, মদিনা সনদের আলোকে দেশ পরিচালনার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বর্তমান আইন প্রণয়নের অবস্থানের অসঙ্গতি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এমন আইন পাস করা হলে তা রাজনৈতিকভাবে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। এর আগে বিলটি সংসদে পাসের সময় বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানিয়ে ওয়াকআউট করেছিলেন।
সমাবেশে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খানও সরকারের বিভিন্ন আইন প্রণয়ন নিয়ে সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ আইনসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে সরকার এমন পরিবর্তন এনেছে, যা তিনি গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারভিত্তিক শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন। এসব আইন পুনর্বিবেচনারও দাবি জানান তিনি।
জামায়াতের কর্মসূচিতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার নেতারাও বক্তব্য দেন। দলটির নেতারা সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন আইন প্রত্যাহার বা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে বলেন, দাবি আদায় না হলে ভবিষ্যতে আন্দোলন আরও জোরদার করা হতে পারে।
অন্যদিকে, হেফাজতে ইসলাম সরাসরি আইনটি বাতিলের বদলে এর প্রয়োগ ও শরিয়াহর সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়টি পর্যালোচনার ওপর জোর দিয়েছে। সংগঠনটির আমির শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজিদুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেন, বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবার নিরাপত্তা, চিকিৎসা এবং সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। এ কারণে জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের সুরক্ষায় ইতিবাচক কোনো উদ্যোগ থাকলে তা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একই সঙ্গে মুসলিম পরিবারের সম্পত্তি বণ্টন, হেবা ও মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে শরিয়াহভিত্তিক বিধানের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের বক্তব্য, নতুন কোনো আইন বা বিধান যেন মুসলমানদের প্রচলিত মিরাস ও হেবা ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। এ বিষয়ে আইনটির প্রয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা মনে করে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, ইসলামী শরিয়াহতে সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে নির্ধারিত রয়েছে। তাই নতুন কোনো পদ্ধতি যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, সম্পত্তি দানের পর মা-বাবাকে উচ্ছেদের মতো সামাজিক সমস্যা শুধু আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব ও সম্মানের বিষয়টি পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলার ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি কাঠামো কার্যকর করার ওপর জোর দেন তিনি। তবে শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন ইসলামী আন্দোলনের এই নেতা।
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা সংশোধিত আইনের মূল বিষয়টি হলো সম্পত্তি হস্তান্তরের পর দাতার জীবনকালীন ভোগদখলের অধিকার। সংসদে পাস হওয়া বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সম্পর্কের ব্যক্তিদের কাছে সম্পত্তি দান বা হস্তান্তরের পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তিটি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার রাখতে পারবেন। এ ধরনের বিধানের মাধ্যমে বিশেষ করে সন্তানদের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি আইনি কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইনটির সমর্থকদের দৃষ্টিতে, বয়স বাড়ার পর নিজের সম্পত্তি সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার কারণে অনেক মা-বাবা পরবর্তীতে ভোগদখল ও নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন। নতুন বিধান সেই ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে পরিবারে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে প্রবীণ মা-বাবার অধিকার রক্ষায় আইনটি একটি সুরক্ষা কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে।
তবে সমালোচকদের উদ্বেগ মূলত ধর্মীয় বিধান, সম্পত্তির মালিকানা এবং হস্তান্তরের আইনি প্রকৃতি নিয়ে। তাদের মতে, সম্পত্তি দান বা হেবা করার পর মালিকানা ও ভোগদখলের অধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেটি স্পষ্ট ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি। একই সঙ্গে মুসলিম নাগরিকদের ক্ষেত্রে শরিয়াহভিত্তিক পারিবারিক বিধান এবং রাষ্ট্রীয় আইনের মধ্যে কোনো বিরোধ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ফলে সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন আইন এখন শুধু একটি আইনি পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি ধর্মীয় বিধান, পারিবারিক অধিকার, প্রবীণদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় আইনব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোর আপত্তির কারণে আইনটির প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা নিয়ে সামনে আরও বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগ দূর করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে প্রবীণ মা-বাবার সম্পত্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, অন্যদিকে ধর্মীয় ও পারিবারিক বিধানের সঙ্গে আইনের সামঞ্জস্য নিয়েও স্পষ্টতা থাকা জরুরি। এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রেখে আইনটি কীভাবে কার্যকর করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল ২০২৬ পাসের পর এর উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে ধর্মীয় পরিসর পর্যন্ত আলোচনা জোরালো হয়েছে। জামায়াত বিক্ষোভের মাধ্যমে আইনটির বিরোধিতা করেছে, হেফাজত বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে এবং ইসলামী আন্দোলন সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট মহলের নজর থাকবে আইনটির বাস্তব প্রয়োগ এবং সরকারের পক্ষ থেকে এসব আপত্তির বিষয়ে কী ধরনের অবস্থান নেওয়া হয় তার দিকে।