অটোরিকশায় কিউআর কোড, আসছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১২ বার
অটোরিকশায় কিউআর কোড, আসছে ডিজিটাল ট্র্যাকিং

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে এসব যানকে নিবন্ধন, নজরদারি ও নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার আওতায় প্রতিটি অটোরিকশায় কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক অবৈধ অটোরিকশা চালানোর সুযোগ বন্ধ করার পাশাপাশি যানগুলোর চলাচল ও পরিচয় শনাক্ত করা সহজ হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

সোমবার জাতীয় সংসদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে এক মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় তৈরি হওয়া সমস্যা এবং এসব যানকে নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা কাজ করছে। সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর দাবি, এসব ক্যামেরা চালুর পর ট্রাফিক আইন অমান্য করার বিভিন্ন প্রবণতা অনেকাংশে কমেছে। লালবাতি অমান্য, অনিয়ম করে লেন পরিবর্তন কিংবা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর মতো কর্মকাণ্ড শনাক্ত করা সহজ হয়েছে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে নম্বর প্লেট না থাকায় ক্যামেরায় কোনো অনিয়ম ধরা পড়লেও সংশ্লিষ্ট যান শনাক্ত করে জরিমানা বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

এ কারণেই অটোরিকশাকে নিষিদ্ধ না করে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্য, কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে। একই সঙ্গে বহু মানুষের জীবিকা এই পরিবহনের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে হঠাৎ করে এসব যান বন্ধ করে দিলে চালক, মালিক, গ্যারেজকর্মী, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশাজীবী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সংসদে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান দেশের নগর ও গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হওয়ায় এসব যান সাধারণ মানুষের জন্য একটি সহজ পরিবহন বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এর সঙ্গে গড়ে উঠেছে বড় ধরনের অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

তবে নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার নিয়ে সরকারের উদ্বেগও রয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। বিশেষ করে অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্ট, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, পুরোনো প্রযুক্তির ব্যাটারি ব্যবহার এবং প্রধান সড়কে অনিয়ন্ত্রিত চলাচলকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। এসব যান দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে বলে তিনি সংসদকে জানান। এর বিপরীতে বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে সরকারের ধারণা। এসব অবৈধ সংযোগের কারণে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির কথাও সংসদে তুলে ধরা হয়।

ব্যাটারির পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে অনেক অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-এসিড ব্যাটারি সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহার না হলে সিসাসহ ক্ষতিকর উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে মাটি, পানি ও বায়ু দূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়। ব্যাটারি উৎপাদন, ব্যবহার এবং পরিত্যক্ত ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের পুরো প্রক্রিয়াকে পরিবেশবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা তাই সামনে এসেছে।

সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যুক্ত ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। যদিও দুর্ঘটনার পেছনে শুধু একটি নির্দিষ্ট যানকে দায়ী না করে সড়কের অবস্থা, চালকের দক্ষতা, যানবাহনের নকশা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগসহ সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বর্তমানে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। অবৈধভাবে চলাচল করা যান জব্দ করে ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করতে ডিএমপি, ডেসকো ও ডিপিডিসির সমন্বিত অভিযান চলছে বলে সংসদে জানানো হয়েছে।

এদিকে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। ১৭টি সিগন্যালে স্থাপিত ৫০টি এআই ক্যামেরা থেকে ইতিবাচক ফল পাওয়ার পর তেজগাঁও ও রমনা এলাকায় আরও ২০০টি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে এসব প্রযুক্তি পুরো রাজধানীতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অটোরিকশায় ডিজিটাল পরিচয় যুক্ত হলে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থার সঙ্গে এসব যানকে যুক্ত করাও সহজ হতে পারে।

সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, তার উদ্দেশ্য অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা নয়। বরং নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় এনে এসব যানকে আরও নিরাপদ ও শৃঙ্খলিতভাবে পরিচালনার ব্যবস্থা করা। তিনি অটোরিকশায় নম্বর প্লেট সংযোজন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের আওতায় আনা, নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে চলাচলের ব্যবস্থা এবং সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন।

তার বক্তব্যে আরও উঠে আসে ঢাকার ভেতরে প্রতিদিন নতুন অটোরিকশা যুক্ত হওয়ার বিষয়টি। এতে সড়কে চাপ বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণও বাড়ছে বলে তিনি দাবি করেন। তিনি অটোরিকশা জব্দ ও ডাম্পিংয়ের পরিবর্তে একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতির আওতায় এসব যান পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে গলিপথ ও নির্দিষ্ট এলাকার জন্য আলাদা চলাচল ব্যবস্থা এবং বিআরটিএর নিবন্ধন কার্যকর করার প্রস্তাব দেন তিনি।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে অটোরিকশা ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও বিধিবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নীতির অন্যতম লক্ষ্য হলো অটোরিকশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কর্মসংস্থান যেন হঠাৎ করে বন্ধ না হয়। অর্থাৎ সরকারের পরিকল্পনা শুধু নিয়ন্ত্রণ আরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা।

নতুন ব্যবস্থায় ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রতিটি অটোরিকশার আলাদা পরিচয় নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু হলে কোনো যান বৈধভাবে নিবন্ধিত কি না, সেটি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে একটি নিবন্ধন নম্বরের অধীনে একাধিক যান পরিচালনার মতো অনিয়ম ঠেকানো সহজ হবে। চালক, মালিক এবং যানবাহনের তথ্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনা গেলে দুর্ঘটনা বা অপরাধের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট যান শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়তে পারে।

পরিবেশের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে লেড-এসিড ব্যাটারির পরিবর্তে তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন ব্যাটারি ব্যবহারের পাশাপাশি চার্জিং অবকাঠামো, বিদ্যুৎ সংযোগের বৈধতা এবং ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপদ পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নীতিমালা কার্যকর হলে এসব বিষয়ে বাস্তবায়ন কতটা কঠোরভাবে করা হয়, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

অটোরিকশাকে ঘিরে সরকারের নতুন উদ্যোগ তাই একদিকে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা, অন্যদিকে একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী যাতায়াতের সুযোগ ধরে রাখার সমন্বিত প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাকে একদিনে বদলে ফেলা সম্ভব নয়। তবে ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড, ট্র্যাকিং, প্রশিক্ষিত চালক, নির্দিষ্ট চলাচল এলাকা এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাটারির মতো উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা খাতকে আরও নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত কাঠামোর মধ্যে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে নীতিমালাকে কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা। একই সঙ্গে চালক ও মালিকদের হয়রানি না করে নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া, নির্ধারিত নিয়ম ভাঙলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা দেওয়া প্রয়োজন। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া এই পরিবহন ব্যবস্থাকে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে সড়ক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান—দুই দিকেই ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত