প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ এক ব্যক্তিকে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি) জানিয়েছে, অভিযানে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় হেলাল মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। তার সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তি অভিযানের সময় পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
সোমবার রাতে টেকনাফ উপজেলার উনচিপ্রাং সীমান্তের জসিমের ঘের এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে উনচিপ্রাং বিওপির একটি টহল দল সেখানে অবস্থান নেয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় সন্দেহজনক গতিবিধি লক্ষ্য করার পর বিজিবি সদস্যরা অভিযান শুরু করেন।
বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাতে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দুই ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। টহল দলের সদস্যরা তাদের থামার জন্য চ্যালেঞ্জ করলে তারা দ্রুত পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় বিজিবি সদস্যরা ধাওয়া করে হেলাল মিয়াকে আটক করতে সক্ষম হন। তবে তার সঙ্গে থাকা অপর ব্যক্তি সীমান্তবর্তী এলাকার অন্ধকার ও দুর্গম ভূখণ্ডের সুযোগ নিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
আটকের পর ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালায় বিজিবি। তল্লাশির একপর্যায়ে দুটি পোটলার মধ্যে খাকি রঙের প্যাকেট পাওয়া যায়। এসব প্যাকেটের ভেতরে নীল রঙের বায়ুরোধী প্যাকেট ছিল। পরে সেগুলো খুলে মোট ১৫টি প্যাকেট থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা ইয়াবাগুলো সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আনা হচ্ছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তি মিয়ানমার সীমান্ত থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করে অধিক দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে সেগুলো বহন করছিলেন বলে জানিয়েছেন বলে বিজিবি দাবি করেছে।
আটক হেলাল মিয়া টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কাঞ্জরপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি ওই এলাকার মো. সোলেমানের ছেলে। তার বয়স ২৫ বছর বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্তের দুর্গম চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা এবং নাফ নদীর বিভিন্ন অংশকে ব্যবহার করে মাদক পাচারের চেষ্টা হয়ে থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি পাচারকারীরাও কৌশল পরিবর্তন করে মাদক পরিবহনের চেষ্টা করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়।
সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় ইয়াবার চালান আটকের ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক দিনেও টেকনাফ ও উখিয়া এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পৃথক অভিযানে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক উদ্ধারের খবর এসেছে। এর ফলে সীমান্তে মাদক পাচার ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
সোমবার রাতের অভিযানে বিজিবির টহল দলের তৎপরতায় বড় একটি ইয়াবার চালান দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের আগেই আটকের দাবি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এ ধরনের অভিযান শুধু মাদক উদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে পাচারচক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করা এবং সীমান্তপথে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার বিষয়টিও জড়িত।
উখিয়া ব্যাটালিয়ন (৬৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অন্যান্য অবৈধ পণ্য প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবির নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। মাদক সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও চোরাকারবারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, সীমান্ত পাহারার পাশাপাশি চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধে বিজিবি কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।
টেকনাফ সীমান্তে একসঙ্গে দেড় লাখ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি স্থানীয় পর্যায়েও গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ মাদক পাচারের সঙ্গে শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ই জড়িত নয়, এর প্রভাব পড়ে সীমান্তবর্তী জনপদ ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সামাজিক পরিবেশেও। ইয়াবার মতো মাদক তরুণ সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও পারিবারিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। ফলে সীমান্তে মাদক প্রবেশের পথ বন্ধ করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সীমান্তে মাদক আটকের পাশাপাশি মাদকের চাহিদা কমানো, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত এবং পাচারের সঙ্গে জড়িত পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। শুধু বাহক আটক করে মাদক পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন। এর পেছনে থাকা অর্থের উৎস, সরবরাহকারী এবং স্থানীয় ও আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ শনাক্ত করাও জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে একের পর এক মাদকের চালান আটকের ঘটনাও দেখাচ্ছে যে, সীমান্তপথে মাদক প্রবেশের চেষ্টা এখনো সক্রিয়। এ অবস্থায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সীমান্তে টহল বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, অভিযানে আটক হেলাল মিয়ার বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করবে। উদ্ধার করা ইয়াবার উৎস, চালানটির গন্তব্য এবং এর সঙ্গে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। বিশেষ করে অভিযানের সময় পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে শনাক্ত ও আটক করা গেলে চালানটির পেছনে থাকা নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সীমান্তে মাদকের বড় চালান আটকের ঘটনাগুলো একদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হলেও অন্যদিকে এগুলো মাদক পাচারের ব্যাপকতারও ইঙ্গিত দেয়। তাই বিচ্ছিন্নভাবে চালান আটকের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
উনচিপ্রাং সীমান্তে সর্বশেষ অভিযানে দেড় লাখ ইয়াবা উদ্ধার এবং একজনকে আটকের ঘটনায় আপাতত একটি বড় চালান দেশের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়া থেকে ঠেকানো গেছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। এখন তদন্তের মাধ্যমে এই চালানের সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং সীমান্তের কোন পথ ব্যবহার করে মাদকটি বাংলাদেশে প্রবেশ করানো হচ্ছিল, তা বেরিয়ে আসাই সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।