প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সম্পত্তি দান বা হস্তান্তরের পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন—এমন বিধান রেখে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত সংশোধনী বিল। আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই এর উদ্দেশ্য, প্রয়োগ এবং ধর্মীয় উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন ধর্মীয় মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের কেউ কেউ আইনটিকে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী বলেও সমালোচনা করেছেন। তবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, নতুন বিধান কারও ধর্মীয় আইন, হেবা বা প্রচলিত সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতিতে বাধা সৃষ্টি করবে না।
আইনমন্ত্রীর দাবি, নতুন আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো জীবনের শেষ সময়ে অসহায় হয়ে পড়া বাবা-মাকে সন্তানের হাতে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও সুরক্ষা দেওয়া। তিনি মনে করেন, সমাজে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে যেখানে বাবা-মা জীবিত থাকতেই সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর ওই সম্পত্তিতে তাদের থাকার বা ভোগ করার অধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সন্তান সম্পত্তির মালিক হওয়ার পর বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এসব বাস্তবতা থেকেই নতুন বিধানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, অনেক বাবা-মা শেষ বয়সে সন্তানদের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে চান না। ফলে তাদের অধিকার রক্ষায় শুধু মামলা করার সুযোগ রাখা যথেষ্ট নয়। ২০১৩ সালের পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইনে বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় অনেক প্রবীণ মানুষ সেই পথ বেছে নিতে অনিচ্ছুক। তাই সম্পত্তি হস্তান্তরের সময়ই বাবা-মায়ের জীবনকালীন ভোগাধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
নতুন বিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন সম্পত্তির মালিকানা ও ভোগাধিকারের মধ্যে পার্থক্যকে। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো বাবা বা মা সন্তানকে সম্পত্তি দান করে দিলে দানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মালিকানা সন্তানের কাছে চলে যাবে। কিন্তু নতুন আইনের অধীনে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার রাখতে পারবেন। অর্থাৎ মালিকানা ও জীবনকালীন ভোগাধিকার একই ব্যক্তির হাতে না-ও থাকতে পারে।
আইনমন্ত্রীর ভাষায়, এটিকে সম্পত্তির মালিকানা বা ‘কর্পাস’ এবং ভোগাধিকার বা ‘ইউসুফ্রাক্ট’-এর পৃথক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দানের পর সম্পত্তির মালিক হবেন গ্রহীতা, কিন্তু দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত নির্ধারিত শর্তে সম্পত্তিটি ব্যবহার ও ভোগ করতে পারবেন। তার মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
নতুন আইন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে মুসলিমদের প্রচলিত হেবা ও উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে ঘিরে। বিরোধী দলসহ কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, নতুন বিধানের কারণে হেবা, দান এবং ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তবে আইনমন্ত্রী এ আশঙ্কা নাকচ করে বলেছেন, আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রচলিত হেবা, গিফট বা অন্য ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনকে এই বিধান ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাগ্রস্ত করবে না।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ একটি বহুধর্মীয় দেশ। মুসলিমদের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষের বসবাস এখানে। প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এসব পার্থক্য বিবেচনায় রাখা হয়েছে। কেউ নিজের ধর্মীয় বিধান অনুসারে সম্পত্তি পরিচালনা করতে চাইলে নতুন আইন তার পথে বাধা হবে না বলে দাবি করেন আইনমন্ত্রী।
হেবা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, হেবা আগের মতোই থাকবে। নতুন আইন হেবার ওপর কোনো শর্ত আরোপ করছে না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হেবার ক্ষেত্রে প্রচলিত ইসলামী বিধানকে অপরিবর্তিত রাখার বিষয়টি আইনের মধ্যেই নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে নতুন বিধানকে হেবা বা মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আইনমন্ত্রী জানান, আইনটি প্রণয়নের আগে কয়েকজন ইসলামি স্কলার ও আইনজীবীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে জামায়াতপন্থী আইনজীবী হিসেবে পরিচিত শিশির মনিরের সঙ্গেও কথা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার দাবি, শিশির মনির ব্যক্তিগতভাবে আইনের মধ্যে কোনো ভুল দেখছেন না বলে তাকে জানিয়েছেন। তবে বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন ও বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে।
বিরোধীদের অভিযোগের বিষয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, নতুন আইনকে ইসলামবিরোধী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে ভুলভাবে। তার দাবি, আইন প্রণয়নের সময় বিভিন্ন দেশের আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তও বিবেচনা করা হয়েছে। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ এবং ভারত, পাকিস্তান ও প্রিভি কাউন্সিলের সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
আইনের বাস্তব প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দাতা সম্পত্তি দান করার পর সেটি বিক্রি বা বন্ধক রাখতে পারবেন কি না। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য স্পষ্ট—দাতা জীবনকালীন ভোগাধিকার রাখলেও সম্পত্তির মালিকানা তার কাছে থাকবে না। ফলে তিনি নিজের ইচ্ছামতো ওই সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন না। দানের পর মালিকানা থাকবে গ্রহীতার কাছে, আর দাতার থাকবে নির্ধারিত জীবনকালীন ভোগের অধিকার।
আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে, দাতা যদি ভোগাধিকার থেকে বঞ্চিত হন তাহলে তিনি কী করবেন। আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে জেলা জজের কাছে সরাসরি আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে তার ধারণা, নতুন আইনের বিধান যথেষ্ট স্পষ্ট হওয়ায় এ ধরনের বিরোধ তুলনামূলকভাবে কম হবে। কারণ দানের সময়ই দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার আইনগতভাবে নির্ধারিত থাকলে পরবর্তীতে সন্তান বা অন্য উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে বিরোধের সুযোগ কমে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
আইনমন্ত্রী আরও দাবি করেন, নতুন বিধানের ফলে সম্পত্তি-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা বরং কমতে পারে। কারণ সম্পত্তির মালিকানা ও দাতার ভোগাধিকার আগেই স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। ফলে ভবিষ্যতে সন্তান বা অন্য পক্ষের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে বিষয়টি নিয়ে নতুন করে মালিকানা নির্ধারণের প্রয়োজন কমবে। তবে বাস্তবে আইন কার্যকর হওয়ার পর এর প্রভাব কতটা হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
উত্তরাধিকার আইন পাশ কাটিয়ে সম্পত্তি বণ্টনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে কি না—এমন আশঙ্কার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কোনো বাবা যদি জীবিত অবস্থায় নিজের সব সম্পত্তি একজন সন্তানকে দান করেন এবং নিজে জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে দেন, তাহলে অন্য সন্তানদের ভবিষ্যৎ অধিকার কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আইনমন্ত্রী এ ক্ষেত্রে বলেছেন, এমন পরিস্থিতির সুযোগ প্রচলিত হেবাতেও রয়েছে। নতুন আইন উত্তরাধিকার বণ্টনের নিয়ম পরিবর্তন করছে না বলেও তিনি দাবি করেন।
আইনটি নিয়ে ধর্মীয় বিতর্কের পাশাপাশি এর সামাজিক প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। বাংলাদেশের পরিবারব্যবস্থায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও ভরণপোষণ নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রবীণ মানুষ আর্থিক ও শারীরিকভাবে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। জীবনের সঞ্চয় দিয়ে সন্তানদের জন্য সম্পদ তৈরি করার পর সেই সম্পদের ওপর নিজের নিরাপত্তা হারালে তাদের পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন আইনের মাধ্যমে এমন মানুষদের জন্য আগাম সুরক্ষা তৈরি করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী।
তবে আইনটির সফলতা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় দাতার ইচ্ছা সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা, গ্রহীতার মালিকানা ও দাতার ভোগাধিকার স্পষ্ট রাখা এবং ভবিষ্যৎ বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ যাতে আইনটির সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারেন, সে জন্য পরিষ্কার নির্দেশনা ও জনসচেতনতাও প্রয়োজন।
আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, আপাতত নতুন আইন সংশোধনের প্রয়োজন তিনি দেখছেন না। তবে ভবিষ্যতে বাস্তব প্রয়োগের সময় কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা পর্যালোচনা করা হবে। বিরোধী দল বা অন্য কোনো পক্ষ থেকে আইনসংগত ও ইতিবাচক প্রস্তাব এলে সেটিও বিবেচনার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সব মিলিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত নতুন বিধানটি একদিকে প্রবীণ বাবা-মায়ের জীবনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ হিসেবে সামনে এসেছে, অন্যদিকে এর ধর্মীয় ও আইনগত প্রভাব নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সরকারের বক্তব্য হলো, নতুন বিধান কারও ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন বা হেবা ব্যবস্থাকে বাতিল বা পরিবর্তন করছে না। এখন আইনটি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হয় এবং প্রবীণ মানুষের সুরক্ষা ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ কমাতে এটি কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই এর গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।