প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা প্রকৌশলী মো. মনোয়ার হোসেন চৌধুরী আর নেই। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত ৯টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। পারিবারিক সূত্রে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর মৃত্যুতে গোবিন্দগঞ্জসহ গাইবান্ধার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে শোকের আবহ নেমে এসেছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। স্বজনেরা তাঁর রুহের মাগফিরাতের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
মনোয়ার হোসেন চৌধুরী গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, এলজিইডির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শেষ করার পর তিনি সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজ এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান।
গাইবান্ধা-৪ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মনোয়ার হোসেন চৌধুরী। ওই নির্বাচনে তিনি উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জয় পান। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। তবে রাজনীতিতে তাঁর সক্রিয়তা থেমে থাকেনি। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে তিনি আবারও গাইবান্ধা-৪ আসনে জয়ী হন।
দুই দফায় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল গোবিন্দগঞ্জের মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। নির্বাচনী রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং এলাকার বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল বলে স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিতি ছিল। পেশাগত জীবনে প্রকৌশলী হিসেবে অর্জিত অভিজ্ঞতাও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে ওঠে।
তাঁর রাজনৈতিক জীবন অবশ্য সবসময় একরৈখিক ছিল না। গাইবান্ধা-৪ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে দলের ভেতরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা গেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার পর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আবুল কালাম আজাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় মনোয়ার হোসেন চৌধুরী পরাজিত হন। পরে ২০১৮ সালে তিনি আবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে অংশ নেন এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি গোবিন্দগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতেও মনোয়ার হোসেন চৌধুরী ছিলেন পরিচিত মুখ। দীর্ঘ সময় ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে দলটির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুতে সেই রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও শোকের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর পারিবারিক জীবন নিয়েও স্থানীয়ভাবে মানুষের আগ্রহ ছিল। তাঁর ভাতিজা মাসুম লুমেন মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে তাঁকে নম্র, ভদ্র ও সৎ মানুষ হিসেবে স্মরণ করেছেন। তিনি পরিবারের পক্ষ থেকে মরহুমের রুহের মাগফিরাতের জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন। একজন ঘনিষ্ঠ স্বজনের এমন স্মৃতিচারণে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি মানবিক দিকও সামনে এসেছে।
একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে তাঁর দীর্ঘ পেশাজীবন ও পারিবারিক সম্পর্কও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর ক্ষেত্রেও বিষয়টি ভিন্ন নয়। প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন থেকে রাজনীতির মাঠে আসা এবং পরে জাতীয় সংসদের সদস্য হওয়া—তাঁর জীবনের পথচলায় ছিল একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
তাঁর মৃত্যু এমন এক সময়ে হলো, যখন বাংলাদেশের রাজনীতি বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকায় দলটির সাবেক নেতাদের রাজনৈতিক অবস্থানও নতুন বাস্তবতায় ভিন্ন প্রেক্ষাপট পেয়েছে। এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই দলটির সাবেক সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর মৃত্যুর খবর সামনে এলো।
তবে মৃত্যুর সংবাদে রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে তাঁর পরিবার, স্বজন ও দীর্ঘদিনের পরিচিত মানুষের শোকই এখন বেশি দৃশ্যমান। একজন প্রবীণ মানুষের চলে যাওয়া তাঁর পরিবারে যেমন অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে, তেমনি দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও পরিচিতজনদের কাছেও তা হয়ে ওঠে স্মৃতিচারণের মুহূর্ত। গোবিন্দগঞ্জের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ উপস্থিতির কারণে স্থানীয় অনেক মানুষের কাছেই তাঁর মৃত্যু একটি পরিচিত অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। পরিবার ও স্বজনেরা তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। তাঁর জীবনের রাজনৈতিক ও পেশাগত কর্মকাণ্ড স্মরণ করে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন মহলও শোক প্রকাশ করছে।
গাইবান্ধা-৪ আসনের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ সময়ের উপস্থিতি, দুই দফায় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পেশাগত পরিচয়—সব মিলিয়ে মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর জীবন ছিল বহুমাত্রিক। তাঁর চলে যাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা হারালেন আপনজন, আর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও পরিচিতজনেরা হারালেন তাঁদের পরিচিত এক মুখ।
মরহুমের পরিবার তাঁর রুহের মাগফিরাতের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছে। মৃত্যুর সংবাদে শোকাহত স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।