সুদের ফাঁদে পীরগঞ্জের অর্ধশত শিক্ষক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১৭ বার
সুদের ফাঁদে পীরগঞ্জের অর্ধশত শিক্ষক

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুরের পীরগঞ্জে বিপদের সময়ে সাময়িক আর্থিক স্বস্তির আশায় নেওয়া ঋণই এখন অনেকের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় এক দাদন ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে চড়া সুদে ঋণ দেওয়া, ঋণের বিপরীতে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নেওয়া, টাকা পরিশোধের পরও সেই চেক ফেরত না দেওয়া এবং পরে চেকে ইচ্ছামতো অঙ্ক বসিয়ে মামলা করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এমন পরিস্থিতিতে শুধু তাঁরা নন, তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও আইনি ও আর্থিক চাপের মধ্যে পড়েছেন।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন উপজেলার চতরা ইউনিয়নের নাদনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা জিয়াউর রহমান জিয়া। স্থানীয়ভাবে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তিনি চতরা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ব্যক্তিগত ঋণ দেওয়ার একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জিয়াউর রহমান।

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, জরুরি প্রয়োজনে অর্থের প্রয়োজন হলে অনেকেই ব্যাংক বা আনুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছ থেকে টাকা নিতেন। ঋণ দেওয়ার সময় ব্যাংক হিসাবের স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ঋণের টাকা ও সুদ পরিশোধের পর এসব কাগজ ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত না দিয়ে পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক।

এ ধরনের অভিযোগের একটি উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে চতরা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রয়াত সতীশ চন্দ্রের পরিবারের ঘটনা। পরিবারের সদস্যদের দাবি, সংসারের আর্থিক সংকটের সময় তিনি জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে ৪ লাখ ২২ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এর বিপরীতে একটি ফাঁকা ব্যাংক চেক জামানত হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। পরিবারের দাবি, কয়েক বছর ধরে সুদসহ প্রায় ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করার পরও ঋণের হিসাব শেষ হয়নি। পরে সুদের বকেয়া দেখিয়ে ২০ শতক জমি লিখে দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়।

সতীশ চন্দ্র প্রায় দুই বছর আগে মারা গেলেও বিষয়টির ইতি হয়নি বলে তাঁর স্বজনদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, তাঁর জমা রাখা চেকে পরে ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা বসিয়ে মামলা করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত পরিবারকে আরও দুই লাখ টাকা দিয়ে স্থানীয়ভাবে সমঝোতা করতে হয়েছে।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বড় আলমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহফুজার রহমান। তাঁর দাবি, তিনি দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন এবং এর বিপরীতে ফাঁকা চেক ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে তাঁর অজান্তে সোনালী ব্যাংকের চতরা শাখা থেকে সাত লাখ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে তাঁর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং ঋণের প্রকৃত হিসাব ও জমা দেওয়া কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।

বড় আলমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মকবুল হোসেনের অভিযোগও একই ধরনের। তাঁর দাবি, দুই লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে তিনি আট লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। এরপরও তাঁর দেনা শেষ হয়নি। বরং তাঁর নিজের, ছেলের এবং দুই ভাইয়ের নামে আলাদা আলাদা চেক ডিজঅনার মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব মামলায় মোট দাবিকৃত অর্থ প্রায় ৪০ লাখ টাকা।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে সরলিয়া টিএম ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক গোলাম রব্বানীর কাছ থেকে। তাঁর দাবি, তিনি তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন এবং এর বিপরীতে চার লাখ টাকা সুদ দিয়েছেন। এরপরও তাঁর নামে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মামলা করা হয়েছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাঁকে ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আটকে রেখে মারধর করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।

গোলাম রব্বানীকে মারধরের অভিযোগ নিয়ে এর আগে একাধিক সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। আগস্টে ঘটে যাওয়া ওই ঘটনায় তাঁকে চতরা বাজারের একটি ব্যাংক শাখা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে স্থানীয়দের খবরের ভিত্তিতে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। এ ঘটনায় তাঁর পক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানা গেছে।

তবে জিয়াউর রহমান জিয়া এসব অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, উল্টো গোলাম রব্বানীর কাছেই তাঁর টাকা পাওনা রয়েছে। তাঁকে ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। অর্থাৎ দুই পক্ষের বক্তব্যে ঋণের প্রকৃতি, পাওনা অর্থ এবং ঘটনার বাস্তবতা নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নথিপত্র, ব্যাংক লেনদেন, চেক, ঋণের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু কয়েকজন শিক্ষক নন, পীরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার আরও অনেকে একই ধরনের সমস্যায় পড়েছেন। তাঁদের দাবি, ফাঁকা চেকের বিনিময়ে নেওয়া ঋণ পরিশোধের পরও চেক ফেরত না পাওয়ায় ভবিষ্যতে মামলা হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কারও কারও বিরুদ্ধে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত দাবির চেক ডিজঅনার মামলা করার ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত ঋণ ব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। গ্রামাঞ্চলে জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত টাকা পাওয়ার সুযোগ না থাকলে অনেক মানুষ পরিচিত ব্যক্তি বা স্থানীয় ঋণদাতার কাছ থেকে অর্থ ধার করেন। ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সময় ও কাগজপত্রের প্রয়োজন থাকায় অনেকের কাছে ব্যক্তিগত ঋণ সহজ পথ মনে হয়। কিন্তু লিখিত ও স্বচ্ছ চুক্তি ছাড়া এ ধরনের ঋণ নেওয়া হলে পরবর্তী সময়ে সুদের হিসাব, জামানত এবং চেক ব্যবহারের বিষয়টি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে স্বাক্ষর করা ফাঁকা চেক অন্যের কাছে রেখে দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। ঋণগ্রহীতা ও ঋণদাতার মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে সেই চেককে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। পীরগঞ্জের ঘটনাগুলোতেও ভুক্তভোগীদের প্রধান অভিযোগগুলোর একটি হচ্ছে তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া ফাঁকা চেক পরবর্তীতে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে, কারও বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, চেকের তারিখ ও অঙ্ক, ঋণ নেওয়া ও পরিশোধের প্রমাণ, জমির দলিল, মামলা সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজমুল হক জানিয়েছেন, সুদের ব্যবসা ও ফাঁকা চেক দিয়ে হয়রানির বিষয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ অভিযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে অভিযোগের মাত্রা ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য সামনে আসায় স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যাঁরা ঋণ নিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন মূল টাকার চেয়ে সুদ, মামলা ও সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কা নিয়ে বেশি চিন্তিত। কারও ক্ষেত্রে পারিবারিক সঞ্চয় শেষ হয়েছে, কারও ক্ষেত্রে জমি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে, আবার কেউ মামলা মোকাবিলার চাপের মধ্যে রয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন।

একজন শিক্ষকের জন্য শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদানই যেখানে প্রধান দায়িত্ব, সেখানে ব্যক্তিগত ঋণের জটিলতা যদি তাঁকে আদালত, ব্যাংক ও থানার দরজায় ছুটতে বাধ্য করে, তা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে নয়, পরিবার ও পেশাগত জীবনেও বড় চাপ তৈরি করে। পীরগঞ্জের অভিযোগগুলো তাই কেবল অর্থ লেনদেনের বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের নিরাপত্তা, সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা এবং আইনি সুরক্ষার প্রশ্ন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সত্য হলে ফাঁকা চেক ও উচ্চসুদের মাধ্যমে মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপে ফেলার বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগগুলো অসত্য বা অতিরঞ্জিত হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। কারণ ন্যায়বিচারের স্বার্থে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষের বক্তব্য এবং প্রমাণ সমান গুরুত্বে যাচাই করা দরকার।

পীরগঞ্জের এই ঘটনাপ্রবাহ এখন স্থানীয় মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে। জরুরি প্রয়োজনে ঋণ নেওয়া অনেকের জন্য বাস্তবতা হলেও ঋণের শর্ত, সুদের হার, জামানত এবং চেক ব্যবহারের বিষয়টি স্বচ্ছ না হলে সাময়িক স্বস্তির সেই অর্থই ভবিষ্যতে বড় সংকটের কারণ হতে পারে। আর সেই সংকট থেকে মুক্তির পথ হতে পারে স্বচ্ছ হিসাব, লিখিত নথি, আইনি সুরক্ষা এবং অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত