প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
পটুয়াখালীর বাউফলের পালপাড়ায় মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বহুদিনের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার কারিগররা মাটিকে নানা আকৃতিতে রূপ দিয়ে তৈরি করে আসছেন নান্দনিক সব পণ্য। ফুলের টব থেকে শুরু করে খেলনা, কাপ-পিরিচ, থালা-বাসন, বাটি, শোপিচ কিংবা নানা ধরনের নকশাদার সামগ্রী—কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি এসব পণ্য শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও পৌঁছে যায়। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং ও বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ে সেই ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এখন বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
বাউফল ও মদনপুরার পালপাড়ায় প্রায় অর্ধশত মাটির পণ্য তৈরির কারখানা রয়েছে। এসব কারখানাকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বহু মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। উদ্যোক্তা, কারিগর, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও স্থানীয় বিক্রেতাসহ কয়েক হাজার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে এই শিল্প জড়িয়ে আছে। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কারখানায় জেনারেটর চালিয়ে কাজ করতে গিয়ে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়। একই সঙ্গে কমে যাচ্ছে উৎপাদনের পরিমাণ। ফলে অনেক মালিক শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছেন, কারও আবার কর্মীদের বেতন কমাতে হচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে কারিগর ও শ্রমিক পরিবারের ওপর। একসময় মাসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় করে যে পরিবারটি স্বাচ্ছন্দ্যে চলত, এখন সেই পরিবারের আয় অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে। সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবারকে নতুন করে হিসাব কষতে হচ্ছে।
বাউফলের পালপাড়ার এমনই একজন কর্মী বিমল চন্দ্র পাল। চার সদস্যের পরিবার নিয়ে তাঁর সংসার। একটি মৃৎশিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করে মাসে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন তিনি। সেই আয় দিয়ে দুই সন্তানের পড়াশোনাসহ পরিবারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মোটামুটি নির্বাহ করা সম্ভব হতো। কিন্তু কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন তাঁর আয়ও কমেছে। এতে সংসারের স্বাভাবিক ব্যয় চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুধু শ্রমিকদের নয়, মালিকদের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। কমল পাল দীর্ঘদিন ধরে মাটির পণ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত। ছোট পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করে তিনি ধীরে ধীরে দুটি কারখানা গড়ে তুলেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানে একসময় নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ২০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য নানা ধরনের মাটির পণ্য তৈরি করে সরবরাহ করতেন তিনি। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে শোপিচ, ক্রোকারিজ, থালা-বাসন, বাটি, কাপ-পিরিচসহ প্রায় ৫৮ ধরনের পণ্য।
কিন্তু দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ সংকটে সেই উৎপাদনব্যবস্থা এখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কমল পাল জানান, প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিকভাবে কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর চালাতে হয়। এর জন্য ডিজেল বা অন্যান্য জ্বালানি কিনতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। কিন্তু বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের দাম বাড়ানো সবসময় সম্ভব হয় না। ফলে উৎপাদন চালু রেখেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাওয়া যাচ্ছে না।
তার ওপর সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো অর্ডার বাতিল করে দিতে পারে। এতে উদ্যোক্তাদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে দূরের বাজারে সরবরাহের জন্য আগে থেকেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য প্রস্তুত করতে হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় সেই উৎপাদন সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাউফল-বরিশাল মহাসড়কের কাগজীর পুল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গেলে এই শিল্পের উপস্থিতি সহজেই চোখে পড়ে। মহাসড়কের পাশে সারি সারি দোকানে সাজানো থাকে নানা রঙের মাটির তৈরি সামগ্রী। পথচারী কিংবা দূরপাল্লার যাত্রীরা অনেক সময় গাড়ি থামিয়ে এসব পণ্য দেখেন। সৌখিন ক্রেতাদের কেউ কেউ পছন্দের পণ্য কিনেও নেন। স্থানীয় অর্থনীতিতে মৃৎশিল্পের এমন দৃশ্যমান উপস্থিতি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করে আসছে।
মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদাও একেবারে কম নয়। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী এসব পণ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। ফলে একটি কারখানায় উৎপাদন কমে গেলে তার প্রভাব শুধু মালিক বা কয়েকজন শ্রমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত অন্যদের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
পালপাড়ার উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ রয়েছে; অন্যদিকে জেনারেটর চালাতে বাড়তি জ্বালানি খরচ হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় একক পণ্যের ওপর ব্যয়ও বাড়ছে। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
শিশির পাল, বরুণ পাল ও সমির পালসহ কয়েকজন উদ্যোক্তার ছয়টি কারখানা রয়েছে। তাদের কারখানায় উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। উদ্যোক্তাদের দাবি, নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সরবরাহ করতে না পারলে বড় ক্রেতারা অন্য জায়গা থেকে পণ্য নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে শুধু একটি অর্ডার হারানোর ঝুঁকি নয়, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শিশির পাল জানান, পালপাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে মৃৎশিল্পের মাধ্যমে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানা চালু রাখতে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে ব্যয় বাড়ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায় লাভের পরিবর্তে লোকসানের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের আয়েও। কারখানায় কাজের সময় কমে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক আগের মতো কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না। যারা দৈনিক বা উৎপাদনভিত্তিক মজুরিতে কাজ করেন, তাদের ওপর এর প্রভাব আরও বেশি। কাজ কমলে আয় কমে যায়। অথচ পরিবারের ব্যয় কমে না। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের এসব পরিবারের জীবনযাত্রায় চাপ বাড়ছে।
পালপাড়ার কারিগরদের জীবন কেবল একটি পেশার সঙ্গে যুক্ত নয়; এটি তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও অংশ। মাটির তৈরি পণ্যকে আকর্ষণীয় করে তুলতে কারিগরদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয়। মাটি সংগ্রহ, প্রস্তুত করা, পণ্য তৈরি, শুকানো, পোড়ানো, রং করা এবং শেষ পর্যায়ে বাজারজাত করা—প্রতিটি ধাপেই দক্ষতা ও সময় লাগে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে ব্যাঘাত ঘটলে পুরো ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হয়।
এ অবস্থায় উদ্যোক্তারা নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হলে জেনারেটরনির্ভরতা কমবে, উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করা সহজ হবে। এতে কারখানাগুলো আবার স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারবে এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থানও ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বাউফল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জোনের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. আজিজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাউফলে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫ থেকে ৬ মেগাওয়াট। চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধানের কারণে নির্দিষ্ট সময় পরপর লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের পর আবার এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ ও চাহিদার এই ব্যবধান দ্রুত কমানো না গেলে বাউফলের মৃৎশিল্পের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। কারণ এই শিল্পের কারখানাগুলো অনেকাংশে বিদ্যুৎনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। জেনারেটর দিয়ে বিকল্পভাবে উৎপাদন চালানো গেলেও জ্বালানি ব্যয় এত বেশি যে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের পক্ষে দীর্ঘদিন তা বহন করা কঠিন।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অর্ধশতাধিক কারখানার অনেকগুলোই ধীরে ধীরে উৎপাদন কমিয়ে দিতে কিংবা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
বাউফলের মৃৎশিল্প তাই এখন কেবল ব্যবসায়িক সংকটের মধ্যেই নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং একটি দীর্ঘদিনের স্থানীয় ঐতিহ্য। মাটির সঙ্গে জীবন গড়ে তোলা এসব কারিগর ও উদ্যোক্তার প্রত্যাশা, বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। উৎপাদনের চাকা আবার স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে, কারখানাগুলো সচল থাকবে এবং মাটির তৈরি শিল্পপণ্য নিয়ে বাউফলের পালপাড়ার ঐতিহ্যও টিকে থাকবে।