ছাতকে আ.লীগ নেতাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ, বিক্ষোভ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৩৮ বার
ছাতকে আ.লীগ নেতাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ, বিক্ষোভ

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সুনামগঞ্জের ছাতকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতা হাজী স্বপন মিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এ ঘটনায় ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। একই সঙ্গে ওসিকে প্রত্যাহারের দাবিতে সোমবার রাতে ছাতক পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেছেন, স্থানীয় জনতার হাতে মারধরের শিকার হওয়ার পর পুলিশ হাজী স্বপন মিয়াকে নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠায়। পরে তার বিরুদ্ধে কী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বা তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ওসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।

তবে হাজী স্বপন মিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে বা কোনো অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগের কোনো সরকারি নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে স্থানীয়দের করা অন্যান্য অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে হাজী স্বপন মিয়া সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশায় করে ছাতক শহরের তাহির প্লাজার সামনে আসেন। এ সময় স্থানীয় শতাধিক মানুষ তাকে অটোরিকশা থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খবর পেয়ে ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে যায় এবং তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

পরে আহত অবস্থায় হাজী স্বপন মিয়াকে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে পুলিশি পাহারায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে সিলেটের উদ্দেশে নিয়ে যাওয়ার একটি ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে মূল প্রশ্ন দেখা দেয়—পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার পর হাজী স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে কী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না, কোথায় আছেন কিংবা চিকিৎসা শেষে তাকে থানায় নেওয়া হয়েছে কি না, এসব বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়তে থাকে বলে বিক্ষোভকারীরা দাবি করেন।

তাদের অভিযোগ, রোববার রাত থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত থানার ওসির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও হাজী স্বপনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সাংবাদিকরাও পুলিশের কাছ থেকে পরিষ্কার বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ হেফাজত থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে।

স্থানীয় বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ ওসি মিজানুর রহমানের সঙ্গে হাজী স্বপন মিয়ার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তুলেছেন। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকলেও ওই নেতার বাসায় ওসির নিয়মিত যাতায়াত ছিল। এই সম্পর্কের কারণেই পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর হাজী স্বপনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে কি না, সেটি তদন্ত করে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিক্ষোভকারীরা আরও অভিযোগ করেন, হাজী স্বপন মিয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মামলা ও হামলার মাধ্যমে হয়রানি, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল এবং চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতাকে হুমকি দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি ও নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

তবে এসব অভিযোগের কোনোটি সম্পর্কেই প্রতিবেদনে তাৎক্ষণিকভাবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। একইভাবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হাজী স্বপন মিয়ার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিভুক্ত তথ্যের ভিত্তিতেই এসব বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বিষয়ে ছাতক থানার ওসিকে আগে একাধিকবার অবহিত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও আইন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। ফলে এ ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

সোমবার রাত ৮টার দিকে ছাতক পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন স্থানীয়রা। পরে রইছ বোর্ডিং-সংলগ্ন প্রধান সড়কে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা পুলিশ হেফাজত থেকে হাজী স্বপনকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগের তদন্ত দাবি করেন। একই সঙ্গে ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমানকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানান তারা। দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন বিক্ষোভকারীরা।

সমাবেশে ছাতক পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর জসিমউদ্দীন সুমেন, পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জসিম উদ্দিন সালমান, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক বাকি বিল্লাহ এবং উপজেলা জাসাসের আহ্বায়ক আব্দুল আলীম বক্তব্য দেন। তারা বলেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব থাকা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের কারণে আইন প্রয়োগে ভিন্নতা তৈরি হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন ছাতক পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য তানিমুল ইসলাম তানিম, সাবেক পৌর ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুনেম মামনুন, পৌর যুবদলের সদস্য নোমান ইমদাদ কানন, সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ছাতক উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আব্দুল বাকী মুহিতসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

বিক্ষোভকারীদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে স্বচ্ছতার দাবি। তাদের মতে, কোনো ব্যক্তিকে জনতার হাতে মারধরের পর পুলিশ উদ্ধার করলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। এরপর যদি তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। আবার অভিযোগ না থাকলে তাকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টিও যথাযথভাবে পরিষ্কার করা দরকার। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্যের ঘাটতি থাকলে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এদিকে ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে সোমবার রাতে থানায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার অফিসকক্ষ তালাবদ্ধ ছিল। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে পুলিশ হেফাজত থেকে হাজী স্বপন মিয়াকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ এবং ওসির বিরুদ্ধে ওঠা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা অন্য কোনো অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তার সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিক থেকেও ঘটনাটি গুরুত্ব বহন করছে। কারণ স্থানীয় জনতার হাতে একজন ব্যক্তিকে আটক করে মারধর এবং পরে তাকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা নিজেই আইনশৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগের। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের। একইভাবে কোনো অভিযোগ ছাড়াই কাউকে হয়রানি বা শারীরিকভাবে আঘাত করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

এ অবস্থায় হাজী স্বপন মিয়াকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ, তাকে জনতার হাতে মারধরের ঘটনা, পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং পরবর্তী সময়ে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ—সবকিছু একসঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি ওসি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে।

ছাতকের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন স্থানীয়দের মধ্যে যে প্রশ্ন ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার সমাধান শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা বিক্ষোভের মাধ্যমে নয়, বরং নিরপেক্ষ তদন্ত ও তথ্য প্রকাশের মাধ্যমেই সম্ভব। পুলিশের হেফাজতে নেওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা এবং পরবর্তী আইনগত অবস্থান সম্পর্কে প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিষ্কার ব্যাখ্যা এলে বিভ্রান্তিও কমবে। একই সঙ্গে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়ার আগ পর্যন্ত অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা জরুরি।

স্থানীয়রা এরই মধ্যে ওসি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন এবং দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ফলে আগামী দিনে প্রশাসন এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়, অভিযোগের তদন্ত হয় কি না এবং হাজী স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ই এখন ছাতকের স্থানীয় মানুষের নজরে রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত