প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এই উদ্যোগকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বলে অভিযোগ করেছে এনসিপি। দলটির দাবি, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতার পরিচালিত অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত তথ্যকে ভিত্তি করে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাউকে লক্ষ্য করে বা রাজনৈতিক চাপের কারণে এই অনুসন্ধান শুরু করা হয়নি।
সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্যসচিব আখতার হোসেন দলের অবস্থান তুলে ধরেন। বিবৃতিতে তারা অভিযোগ করেন, পতিত আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ছড়ানো বিভিন্ন গুজব, অপপ্রচার ও রাজনৈতিক প্রচারণাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দুদকের নিরপেক্ষতা ও প্রতিষ্ঠানটির দলীয়করণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এনসিপির অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির বিভিন্ন তথ্য ও অভিযোগের উৎস। দলটি দাবি করছে, নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচালিত বা সমর্থিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত তথ্যকে ভিত্তি করে কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি অনুসন্ধান শুরু করে, তাহলে সেই অনুসন্ধানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। দলটির মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের উৎস, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং অনুসন্ধান শুরুর প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ হওয়া জরুরি।
এনসিপি মনে করছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের রাজনৈতিকভাবে দুর্বল ও হেয় করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চালানো হচ্ছে। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানকেও সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে দেখছে দলটি। তাদের অভিযোগ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন এলেও পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির কিছু প্রবণতা এখনও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।
তবে এনসিপির অভিযোগের পাশাপাশি দুদকের বক্তব্যও এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুদক জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদকে লক্ষ্য করে অনুসন্ধান শুরু করা হয়নি। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগে থেকে থাকা বা পেন্ডিং অভিযোগ ও অনুসন্ধানের তালিকা অনুযায়ী নিয়মিত প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সামনে এসেছে। অর্থাৎ, কোনো রাজনৈতিক নির্দেশনা বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে হয়রানির উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় সংস্থাটি।
দুদকের এই বক্তব্যের ফলে রাজনৈতিক বিতর্কটি আরও জটিল হয়েছে। একদিকে এনসিপি অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া ও তথ্যের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন বলছে, আইন ও নিয়ম অনুযায়ী তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে অনুসন্ধানটি কীভাবে পরিচালিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অভিযোগগুলোর বিষয়ে কী ধরনের তথ্য পাওয়া যায়।
এনসিপির নেতারা অবশ্য জানিয়েছেন, তারা কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের বিরোধিতা করছেন না। বরং তাদের বক্তব্য, একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর দুদক থাকলে যেকোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধেও যদি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায় কোনো অভিযোগের অনুসন্ধান হয়, তাহলে দলটি তাতে সহযোগিতা করবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দলটির মতে, দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের দাবি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা বজায় রাখার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত যদি রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে প্রকৃত দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তদন্ত বন্ধ করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
এনসিপি জুলাই সনদের আলোকে স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত দুদক পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে। দলটির নেতাদের বক্তব্য, কমিশনকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার বা রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে। তারা মনে করে, দুদকের কাঠামো, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং কার্যক্রম পরিচালনায় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।
বিবৃতিতে সরকারকে অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না করার আহ্বানও জানিয়েছে এনসিপি। দলটির ভাষ্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে হয়রানি করা হলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছে দলটি।
একই সঙ্গে এনসিপি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের দাবি উপেক্ষা করা হলে ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু বিবৃতি বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োজনে আন্দোলনের কর্মসূচিতে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি। এতে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধানকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এদিকে আসিফ মাহমুদ নিজেও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করে বলেছেন, দেশের বাইরে তার কোনো সম্পদ, বিনিয়োগ বা ব্যাংকে অর্থ থাকার প্রমাণ দেখাতে পারলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেবেন এবং আইন অনুযায়ী যে শাস্তি হবে তা মেনে নেবেন। তার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন।
তবে কোনো অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট তথ্য, নথি, সম্পদের উৎস, আর্থিক লেনদেন এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে তদন্তকারী সংস্থার ক্ষেত্রেও অনুসন্ধানের প্রতিটি ধাপে আইনগত প্রক্রিয়া, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের বিষয়টি তাই এখন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাকে ঘিরে অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত, অভিযোগের তথ্যসূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নও জড়িয়ে গেছে। একদিকে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তার যথাযথ অনুসন্ধান প্রয়োজন, অন্যদিকে সেই অনুসন্ধান যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত দুদকের অনুসন্ধানে কী তথ্য উঠে আসে এবং অভিযোগগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায় কি না, সেটিই নির্ধারণ করবে পরবর্তী পরিস্থিতি। একই সঙ্গে অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় থাকে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের। এনসিপির ক্ষোভ, দুদকের ব্যাখ্যা এবং আসিফ মাহমুদের পাল্টা বক্তব্য—সব মিলিয়ে বিষয়টি আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব পেতে পারে।