প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো আজ মঙ্গলবার সিলেট সফরে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এক দিনের এই সফরকে ঘিরে সিলেট নগরীতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আগমন উপলক্ষে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, সরকারি স্থাপনা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়ে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের সিলেট সফরটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক—দুই দিক থেকেই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি এর আগে বহুবার সিলেটে এসেছেন। দলীয় কর্মসূচি, সাংগঠনিক সভা, রাজনৈতিক সমাবেশ, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে তার সিলেট সফরের নজির রয়েছে। তবে এবার তার আগমন ভিন্ন পরিচয়ে। দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম তিনি সিলেটে যাচ্ছেন। ফলে সফরটিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আগ্রহও রয়েছে আলাদা মাত্রায়।
সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে রাষ্ট্রপতি সিলেটে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বিমানবন্দর থেকে তিনি সিলেট সার্কিট হাউসে যাবেন এবং সেখানে গার্ড অব অনার গ্রহণ করবেন। এরপর তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন। সিলেটের আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এই দুই মাজার রাষ্ট্রপতির সফরের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির অংশ হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
মাজার জিয়ারত শেষে রাষ্ট্রপতি সার্কিট হাউসে ফিরে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সিলেট সিটি করপোরেশন ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা ও সুধী সমাবেশে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতিকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্যও দেবেন। দিনের কর্মসূচি শেষে রাতের ফ্লাইটে তার ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির সফরকে সামনে রেখে সিলেট নগরীতে কয়েক দিন ধরেই প্রস্তুতি চলছিল। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও রাষ্ট্রপতির চলাচলের নির্ধারিত পথগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও করা হয়েছে। বিশেষ করে সার্কিট হাউস, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার এবং নাগরিক সংবর্ধনার স্থানকে ঘিরে প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সাজসজ্জার কাজও করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সফরকে কেন্দ্র করে এসএসএফ, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সমন্বয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও রাষ্ট্রপতির চলাচলের রুটে বিশেষ নজরদারি রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট, তল্লাশি এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির সফর উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি করা হচ্ছে। পাশাপাশি ড্রোন ও বডি ক্যামেরার মাধ্যমেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিশেষায়িত নিরাপত্তা ইউনিটের সদস্যদের পাশাপাশি বোমা শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয়করণ দল, ক্রাইসিস রেসপন্স টিম এবং স্ট্রাইকিং টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির চলাচলের পথ ও কর্মসূচির স্থানগুলোতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার হলেও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল যাতে অতিরিক্ত ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সফরের সময় নিরাপত্তার কারণে সাময়িকভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হলেও নগরবাসীর দুর্ভোগ কমিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে বিমানবন্দর সড়ক, মাজার এলাকা, সার্কিট হাউস ও নাগরিক সংবর্ধনাস্থলের আশপাশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি নজর রাখা হচ্ছে।
সিলেটবাসীর কাছে মির্জা ফখরুলের এবারের সফরের আরেকটি বিশেষ দিক রয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সিলেটের মানুষের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সরাসরি যোগাযোগ করেছেন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তার সফরগুলোতে দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ও রাজনৈতিক কর্মসূচিই ছিল প্রধান। বিভিন্ন সময়ে বন্যা ও দুর্যোগের সময়ও তিনি সিলেটে এসেছেন। এবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার সফরে সেই রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও সাংবিধানিক অবস্থানই সামনে থাকবে।
এই পরিবর্তিত পরিচয়ের কারণে এবারের সফরকে স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই ভিন্নভাবে দেখছেন। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক পদগুলোর অন্যতম সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকায় তার সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশাও রয়েছে। সিলেটের দীর্ঘদিনের বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা, যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যটন, জলাবদ্ধতা, নগর ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের প্রত্যাশা রয়েছে। নাগরিক সংবর্ধনা ও সুধী সমাবেশে এসব বিষয় আলোচনায় আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে।
সিলেট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও আধ্যাত্মিক নগরী। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারকে ঘিরে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ সিলেটে আসেন। চা-বাগান, পাহাড়, নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে দেশের পর্যটন মানচিত্রেও সিলেটের আলাদা অবস্থান রয়েছে। রাষ্ট্রপতির সফরের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের ঐতিহ্য, পর্যটন সম্ভাবনা এবং নাগরিক প্রত্যাশা জাতীয় পর্যায়ে আরও গুরুত্ব পেতে পারে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
নাগরিক সংবর্ধনা ও সুধী সমাবেশে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতির সামনে সিলেটের সামগ্রিক উন্নয়ন ও নাগরিক সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন প্রত্যাশা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে সিলেটের উন্নয়ন, জাতীয় ঐক্য, নাগরিক অধিকার বা রাষ্ট্র পরিচালনার বৃহত্তর কোনো বিষয় উঠে আসে কি না, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে।
এদিকে রাষ্ট্রপতির আগমন উপলক্ষে সিলেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতির প্রস্তুতিও রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকেও নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তাকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির সফরকে দলীয় কর্মসূচির বাইরে রেখে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সম্পন্ন করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রথম সিলেট সফরকে ঘিরে নগরীতে উৎসাহ, কৌতূহল ও ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে। এক দিনের সফরে মাজার জিয়ারত, রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা এবং নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেবেন তিনি। নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সিলেটবাসীর প্রত্যাশাও এখন সফরটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক জীবনের পরিচিত শহর সিলেটে এবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের আগমন তাই আগের সব সফরের তুলনায় আলাদা গুরুত্ব বহন করছে।