সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল হাজিরায় জোর

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২৪ বার
সরকারি দপ্তরে ডিজিটাল হাজিরায় জোর

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়ানুবর্তিতা, উপস্থিতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম সচিব সভায় প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করা, অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। একই সঙ্গে দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ঘটানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ে নতুন সরকারের প্রথম সচিব সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদসচিব নাসিমুল গনি। সরকারের প্রশাসনিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় সভা হিসেবে পরিচিত সচিব সভায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা অংশ নেন। সভায় সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক কার্যক্রম, উন্নয়ন উদ্যোগ এবং জনগণের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এমন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রায় দুই বছর পর সচিব পর্যায়ে এ ধরনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ায় সভাটিকে প্রশাসনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সচিবদের সঙ্গে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় আর কোনো সচিব সভা হয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় সাত মাস পর আবারও সচিবদের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হলো।

সচিব সভায় সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থাকে কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনে কর্মরতদের নিয়মিত অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহার এবং সরকারি সেবাপ্রত্যাশী মানুষের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাও এর সঙ্গে যুক্ত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

প্রশাসনের একটি বড় অংশ সরাসরি নাগরিক সেবার সঙ্গে যুক্ত। সরকারি অফিসে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অনুপস্থিতি কিংবা সময়মতো দায়িত্বে না থাকা অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তির কারণ হতে পারে। ভূমি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক নিরাপত্তা, সরকারি নথি, লাইসেন্স ও বিভিন্ন অনুমোদনসহ নানা সেবা নিতে প্রতিদিন মানুষ সরকারি দপ্তরে যান। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো উপস্থিতি এবং দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নাগরিক সেবার মানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসে প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য প্রযুক্তিনির্ভরভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। এতে হাজিরা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত উপস্থিতির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে দায়িত্বে অনুপস্থিতি বা সময়ানুবর্তিতায় ঘাটতির বিষয়গুলো চিহ্নিত করে প্রশাসনিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।

সচিব সভায় অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণ, সেবার মান এবং নাগরিকদের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে সভার আলোচনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতে কীভাবে পড়তে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দেশের নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সরকারি ভবন ও স্থাপনায় সৌর প্যানেল স্থাপন, বেসরকারি খাতকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরশক্তির অংশ বাড়ানোর বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় এসেছে।

সচিব সভার আলোচ্যসূচিতে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য উৎসের ভূমিকা নিয়ে নীতিগত আলোচনা হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় সৌরশক্তির অংশ বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি স্থাপনায় সৌর প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে কৃষি, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও গৃহস্থালি—প্রায় সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বাড়লে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি শুধু পরিবেশগত দিক থেকে নয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।

সভায় সরকারি চাকরির শূন্য পদ পূরণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলে প্রশাসনিক কার্যক্রমের গতি কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে নাগরিক সেবার মানেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী শূন্য পদ পূরণ করে সরকারি কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার বিষয়টি আলোচনায় স্থান পেয়েছে।

সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচিগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের বিষয়েও সচিবদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড ও খাল খনন কর্মসূচির মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, উপকারভোগী নির্বাচন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সহায়তামূলক কর্মসূচিতে প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল তালিকা তৈরি হলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বাদ পড়তে পারেন, আবার অনুপযুক্ত ব্যক্তি সুবিধা পেতে পারেন। তাই তথ্য যাচাই, উপকারভোগী নির্বাচন এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর প্রশাসনের নজর রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

একইভাবে খাল খনন কর্মসূচির ক্ষেত্রেও প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজন, কাজের মান, ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। খাল পুনঃখননের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা কমানো, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা এবং কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই এসব কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা এসেছে।

সচিব সভার আলোচনায় প্রশাসনের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল, কল্যাণমুখী ও কার্যকর করার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং মাঠপর্যায়ে তার সুফল পৌঁছে দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হলে প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সচিব সভায় আলোচনার বিষয়গুলো থেকে প্রশাসনে উপস্থিতি, জবাবদিহি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের কার্যকর ফল নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর। ডিজিটাল হাজিরা চালু বা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেটির তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা, অনিয়মের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা এবং নাগরিক সেবার মান উন্নয়নের সঙ্গে বিষয়টিকে যুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারি দপ্তরে প্রযুক্তিনির্ভর হাজিরা ব্যবস্থা জবাবদিহি বাড়ানোর একটি উপায় হতে পারে। তবে এর পাশাপাশি কর্মপরিবেশ, দায়িত্ব বণ্টন, জনবল ঘাটতি এবং সেবার মান—সবকিছুর সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন। একইভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণের পর প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হবে।

নতুন সরকারের প্রথম সচিব সভায় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা থেকে শুরু করে জ্বালানি নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। এখন এসব বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে সাধারণ মানুষ কতটা বাস্তব সুফল পান। বিশেষ করে সরকারি অফিসে সময়মতো উপস্থিতি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক সেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তা ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত